দেশের ৩৭ শতাংশ মানুষ ফোর-জি নেটওয়ার্কের আওতায় থেকেও শুধু স্মার্টফোন না থাকায় ইন্টারনেট সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এই ‘ডিজিটাল বৈষম্য’ দূর করতে স্মার্টফোনের দাম কমানোর উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
কমিশন মনে করছে, স্মার্টফোনের ওপর আরোপিত উচ্চ শুল্ক ও করের (প্রায় ৫৮.৬ শতাংশ) কারণেই দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। আর এই উচ্চমূল্যই দেশে অবৈধ বা ‘গ্রে’ মার্কেটের প্রসার ঘটাচ্ছে, যাতে সরকার বছরে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে।
এই সংকট সমাধানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) শুল্ক ও ভ্যাট কাঠামো যৌক্তিকভাবে পুনর্বিন্যাস করার সুপারিশ করেছে বিটিআরসি। একইসঙ্গে, আগামী ১৬ ডিসেম্বর ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) চালুর আগে বাজারে থাকা অবিক্রীত অবৈধ ফোন নিয়ে সৃষ্ট সংকট নিরসনেও সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে।
সংকট ও বাস্তবতা বিটিআরসি’র তথ্যমতে, উচ্চ করের কারণে ফোনের দাম বেড়ে যাওয়ায় গ্রাহকরা সস্তা, অবৈধ ও ক্লোনড ফোনের দিকে ঝুঁকছে। বর্তমানে দেশের মোবাইল বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশই অবৈধ ফোনের দখলে।
এই ‘গ্রে’ মার্কেটের দাপটে দেশে গড়ে ওঠা ১৭টি মোবাইল ফোন উৎপাদন কারখানাও সংকটে পড়েছে। দেশীয় শিল্প মালিকদের সংগঠন (এমআইওবি) জানিয়েছে, দেশের ৯০ শতাংশ চাহিদা মেটানোর সক্ষমতা থাকলেও ‘গ্রে’ মার্কেটের কারণে তারা মাত্র ৬০ শতাংশ সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারছে।
এনইআইআর (NEIR) নিয়ে আতঙ্ক ও বিটিআরসি’র ৩ সুপারিশ আগামী ১৬ ডিসেম্বর থেকে এনইআইআর (NEIR) ব্যবস্থা চালু হলে দেশে ব্যবহৃত সকল অবৈধ ও ক্লোনড আইএমইআইযুক্ত হ্যান্ডসেট নেটওয়ার্ক থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবে। এই ঘোষণায় বাজারে থাকা লাখ লাখ অবিক্রীত অবৈধ ফোন নিয়ে আর্থিক ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন আমদানিকারক ও খুচরা ব্যবসায়ীরা।
এই সংকট নিরসনে এবং মোবাইল খাতে স্বচ্ছতা আনতে বিটিআরসি’র স্পেকট্রাম বিভাগ সম্প্রতি এনবিআরকে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করেছে:
১. অবৈধ ফোন বৈধ করার সুযোগ: ইতোমধ্যে দেশে প্রবেশ করা অননুমোদিত হ্যান্ডসেটগুলোকে নিবন্ধনের জন্য একটি যৌক্তিক সময়সীমা নির্ধারণ করা। এই সময়ের মধ্যে ব্যবসায়ীরা একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ শুল্ক (যা এনবিআর নির্ধারণ করবে) পরিশোধ করে তাদের পণ্য বৈধ করার সুযোগ পাবেন।
২. শুল্ক-ভ্যাট হ্রাস: বৈধ আমদানিকে উৎসাহিত করতে এবং দেশীয় বাজারে ফোনের দাম কমাতে আমদানি শুল্ক ও মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) দ্রুত হ্রাস করা।
৩. শুল্ক কাঠামোতে সামঞ্জস্য: দেশে উৎপাদিত এবং বিদেশ থেকে আমদানি করা হ্যান্ডসেটের শুল্ক কাঠামোর মধ্যে সামঞ্জস্য আনা, যাতে কোনো পক্ষ বৈষম্যের শিকার না হয়।
‘দাম বাড়বে না, গুজব ছড়াচ্ছে লাগেজ পার্টি’ এনইআইআর (NEIR) চালু হলে মোবাইল ফোনের দাম বাড়বে—এমন প্রচারণাকে ‘গুজব’ বলে উড়িয়ে দিয়েছে দেশীয় মোবাইল ফোন নির্মাতাদের সংগঠন ‘মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রিয়াল অনার্স অব বাংলাদেশ (এমআইওবি)’।
এমআইওবি সভাপতি জাকারিয়া শহীদ বলেন, “এনইআইআর বাস্তবায়ন সরকারের একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। আমরা ফোনের দাম এক টাকাও বাড়াবো না। দেশে উৎপাদন সরঞ্জামের দাম ৬০ শতাংশ বাড়লেও আমরা দাম বাড়াইনি। একটি মহল, বিশেষ করে ‘লাগেজ পার্টি’ (অবৈধ ব্যবসায়ী), সাধারণ গ্রাহকদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য এই বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে।”
বিটিআরসি’র স্পেকট্রাম বিভাগের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আমিনুল হক বলেন, “এনইআইআর চালুর মাধ্যমে দেশের মোবাইল খাতে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও অবৈধ বাণিজ্যের অবসান ঘটবে। আমরা এনবিআরের সঙ্গে সমন্বয় করে শুল্ক-ভ্যাট হ্রাসের বিষয়ে কাজ করছি। এটি বাস্তবায়িত হলে রাজস্ব ফাঁকি রোধ হবে এবং গ্রাহকরা যৌক্তিক মূল্যে মানসম্পন্ন ফোন পাবেন।”






















