চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্ত এখন ভারতের বিভিন্ন রাজ্য থেকে চুরি ও ছিনতাই হওয়া মোবাইল ফোনের প্রধান ‘হাব’-এ পরিণত হয়েছে। হাত বাড়ালেই মিলছে স্বল্প দামের এসব চোরাই ফোন। সোনামসজিদ স্থলবন্দর দিয়ে পণ্য আমদানির আড়ালে, এমনকি সোশ্যাল মিডিয়ায় বিজ্ঞাপন দিয়েও প্রকাশ্যে চলছে এই রমরমা কারবার।
এই অবৈধ বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে সম্প্রতি এক চোরাকারবারি বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)-এর হাতে ধরা পড়ে উল্টো বাহিনীর বিরুদ্ধে ‘টাকা ছিনতাইয়ের’ নাটক সাজিয়েছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে চুরি বা ছিনতাই হওয়া ফোনগুলো পাচার হয়ে চলে আসছে বাংলাদেশের বাজারে। এই চোরাই ফোন বেচাকেনার প্রধান কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে শিবগঞ্জ বাজার। এছাড়া চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের অভিজাত মোবাইল শপিংমল আব্দুল মান্নান সেন্টু মার্কেট, কানসাট বাজার, রানীহাটি বাজারসহ বিভিন্ন মার্কেটে দেদারসে বিক্রি হচ্ছে বক্স-বিহীন এসব পুরোনো ফোন।
চোরাকারবারির ‘৮ লাখ টাকা’ নাটক গত ২৫ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট পল্লী বিদ্যুৎ মোড় এলাকায় মহানন্দা ব্যাটালিয়নের (৫৯ বিজিবি) একটি টহল দল একটি মোটরসাইকেলকে থামার সংকেত দেয়। আরোহীরা একটি ব্যাগ ফেলে পালিয়ে যায়। বিজিবি সেই ব্যাগ তল্লাশি করে ২৪টি ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোন উদ্ধার করে।
এই ঘটনার পর আলমগীর নামে এক ব্যক্তি ফেসবুক লাইভে এসে দাবি করেন, বিজিবি তার ব্যাগে থাকা ৮ লাখ টাকা “ছিনিয়ে নিয়েছে”। এই ভিডিওটি ভাইরাল হলে তোলপাড় শুরু হয়।
তবে বিজিবি বলছে, গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী আলমগীর আলী দীর্ঘদিন ধরে ভারতীয় চোরাই মোবাইল ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। সেদিনও তিনি চোরাকারবারিদের কাছ থেকে ওই ২৪টি মোবাইল সংগ্রহ করেছিলেন। বিজিবির দাবি, এটি একটি সুশৃঙ্খল বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্নের অপচেষ্টা।
এরই মধ্যে অভিযুক্ত চোরাকারবারি আলমগীরের চোরাই মোবাইল কেনার একটি “খসড়া হিসাব” সাংবাদিকদের হাতে এসেছে। তাতে দেখা যায়, তিনি বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ২৪টি চোরাই মোবাইল মোট ৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় কিনেছেন। এর মধ্যে ২ লাখ ৩৮ হাজার টাকা জমা দেন এবং বিক্রেতার কাছে ১ লাখ ৪৭ হাজার টাকা বাকি ছিল। এই হিসাবটিই তার ‘৮ লাখ টাকা’ ছিনতাইয়ের দাবিকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।
১০৭ কোটি টাকার পণ্য জব্দ দেশের যে কয়টি সীমান্ত দিয়ে ভারত থেকে মোবাইল ফোন চোরাচালান হয়, তার মধ্যে সোনামসজিদ অন্যতম। সোনামসজিদ স্থলবন্দরে পণ্য আমদানির আড়ালে মাদক ও অস্ত্রের পাশাপাশি মোবাইল চোরাচালানও চলছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমস পাথরের আড়ালে আসা একটি চালানে আইফোনসহ বিভিন্ন দামি ব্র্যান্ডের ৪২টি মোবাইল ফোন জব্দ করে।
সোনামসজিদ সীমান্ত এলাকায় নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা মহানন্দা ব্যাটালিয়নের (৫৯ বিজিবি) তথ্য বলছে, গত তিন বছরে তারা ১০৭ কোটি টাকার বেশি চোরাচালান পণ্য জব্দ করেছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৩২৪টি ভারতীয় চোরাই মোবাইল ফোন রয়েছে। এই সময়ে আটক করা হয়েছে ২৯১ জন চোরাকারবারিকে।
৫৯ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল গোলাম কিবরিয়া গণমাধ্যমকে বলেন, “চোরাচালান বন্ধে বিজিবি সক্রিয় রয়েছে। সীমান্তে আমাদের তৎপরতা অব্যাহত আছে।”
তবে সোনামসজিদ স্থলবন্দর কাস্টমসের সহকারী কমিশনার সাব্বির আহমেদ জিসান বলেন, “একেবারে নিশ্চিত তথ্য না থাকলে আমরা পণ্যবাহী ভারতীয় ট্রাকে তল্লাশি চালাতে পারি না। তাই বন্দর দিয়ে এক পণ্যের আড়ালে বা ট্রাকচালকদের মাধ্যমে পণ্য চোরাচালানের সুযোগ থেকেই যায়।”






















