অবৈধ মোবাইল ফোন আমদানিকারক ও ব্যবসায়ীদের একটি সিন্ডিকেট এবার দেশীয় মোবাইল শিল্প ধ্বংসের নতুন এক গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছে। এনইআইআর (NEIR) ঠেকাতে ব্যর্থ হয়ে এই চক্রটি এখন দাবি তুলেছে—স্থানীয় প্রস্তুতকারকরা (Local Manufacturers) সরাসরি খুচরা বা রিটেইল ব্যবসা করতে পারবে না।
অর্থাৎ, স্যামসাং, শাওমি, ভিভো বা ওয়ালটনের মতো কোম্পানিগুলো তাদের নিজস্ব ‘ব্র্যান্ড শপ’ বা শোরুমের মাধ্যমে সরাসরি গ্রাহকের কাছে ফোন বিক্রি করতে পারবে না; তাদের পণ্য বিক্রি করতে হবে সিন্ডিকেটের নির্ধারিত থার্ড-পার্টি রিটেইলারদের মাধ্যমে।
কাওরান বাজার দখল করে স্মার্টফোন চোরাচালানকারীদের সংগঠনের পক্ষ থেকে সরকারের কাছে সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে- প্রস্তুতকারকের সঙ্গে বাধ্যতামূলক চুক্তিপত্র বাতিল, বিল অব এন্ট্রি জমা দিলেই হ্যান্ডসেটের স্বয়ংক্রিয় রেজিস্ট্রেশনের ব্যবস্থা, স্টকে থাকা অবিক্রিত হ্যান্ডসেট বিক্রির জন্য কোনো একটি নীতিমালা অথবা অতিরিক্ত সময় প্রদান, বিদেশি হ্যান্ডসেটের ওপর বিদ্যমান ৫৭ শতাংশ শুল্ক কমিয়ে সহনীয় পর্যায়ে আনা, স্থানীয় প্রস্তুতকারকদের রিটেইল বা খুচরা ব্যবসায় সম্পৃক্ততা নিষিদ্ধ করা, এনইআইআর নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা একাধিক মন্ত্রণালয়ের অংশগ্রহণে পরিচালনা করা এবং গবেষণাভিত্তিক এবং বাস্তবসম্মত নীতিমালা প্রণয়ন করা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এটি একটি ‘হাস্যকর’ ও ‘আত্মঘাতী’ দাবি। মূলত ব্র্যান্ড শপগুলো বন্ধ করে পুরো মোবাইল বাজারকে নকল ও চোরাই ফোনের অভয়ারণ্যে পরিণত করতেই এই অপতৎপরতা চালাচ্ছে ‘গ্রে-মার্কেট’ মাফিয়া চক্র।
অনুসন্ধানে সিন্ডিকেটের এই দাবির পেছনে ৩টি প্রধান কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে:
১. নকল ফোন মেশানোর সুযোগ: কোম্পানি যখন সরাসরি ব্র্যান্ড শপে ফোন বিক্রি করে, তখন সেখানে নকল বা চোরাই ফোন ঢোকানোর সুযোগ থাকে না। কিন্তু থার্ড-পার্টি দোকানে আসল ফোনের সঙ্গে নকল ফোন মিশিয়ে বিক্রি করা সহজ। সিন্ডিকেট চায়, কোম্পানিগুলোর নিজস্ব বিক্রয় চ্যানেল বন্ধ হোক, যাতে গ্রাহকরা তাদের (সিন্ডিকেটের) দোকান থেকে ফোন কিনতে বাধ্য হয়।
২. বাজার নিয়ন্ত্রণ: বর্তমানে ১৭টি দেশীয় কারখানার হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগের কারণে মানুষ কম দামে ভালো মানের অফিসিয়াল ফোন পাচ্ছে। উৎপাদকদের রিটেইল ব্যবসা বন্ধ হলে ফোনের দাম নির্ধারণের ক্ষমতা চলে যাবে মধ্যস্বত্বভোগী বা সিন্ডিকেটের হাতে। তখন তারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়াতে পারবে।
৩. এনইআইআর পাশ কাটানো: ব্র্যান্ড শপগুলোতে বিটিআরসি নিবন্ধিত ফোন ছাড়া বিক্রি হয় না। সিন্ডিকেট চায় এই স্বচ্ছ ব্যবস্থা ভেঙে দিতে, যাতে এনইআইআর ফাঁকি দিয়ে অবৈধ ফোন বিক্রি অব্যাহত রাখা যায়।
বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিএমপিআইএ)-এর তথ্যমতে, গত কয়েক বছরে দেশে মোবাইল উৎপাদনে প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ হয়েছে। স্যামসাং, অপো, ভিভো, রিয়েলমি, টেকনো ও সিম্ফনির মতো ব্র্যান্ডগুলো দেশে কারখানা স্থাপন করেছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, “বিশ্বের কোনো দেশেই উৎপাদকদের খুচরা ব্যবসা করতে মানা নেই। অ্যাপল, স্যামসাং বিশ্বজুড়েই নিজেদের স্টোর চালায়। বাংলাদেশে যারা অবৈধ ব্যবসা করে, তারাই কেবল এমন আবদার করতে পারে। সরকার যদি এই অযৌক্তিক দাবিতে কান দেয়, তবে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা মুখ ফিরিয়ে নেবে এবং লাখো মানুষের কর্মসংস্থান বন্ধ হয়ে যাবে।”
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠনগুলো বলছে, উৎপাদক সরাসরি পণ্য বিক্রি করলে মধ্যস্বত্বভোগীর কমিশন থাকে না, ফলে ক্রেতা কম দামে পণ্য পায়। তাছাড়া ব্র্যান্ড শপ থেকে কিনলে আসল পণ্যের নিশ্চয়তা ও সঠিক ওয়ারেন্টি পাওয়া যায়। সিন্ডিকেটের এই দাবি মানা হলে ভোক্তারা সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হবে এবং প্রতারণার শিকার হবে।
আইসিটি মন্ত্রণালয় ও বিটিআরসি সূত্রে জানা গেছে, সরকার কোনোভাবেই অবৈধ সিন্ডিকেটের অন্যায্য আবদারের কাছে নতি স্বীকার করবে না। বরং ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ বা দেশীয় শিল্পকে সুরক্ষা দিতে সরকার বদ্ধপরিকর। ১৬ ডিসেম্বর এনইআইআর চালু এবং বৈধ ব্যবসার পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রশাসন কঠোর অবস্থানেই থাকবে।






















