দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি পণ্য বিক্রেতা প্রতিষ্ঠান ‘রায়ান্স কম্পিউটারস লিমিটেড’-এর বিরুদ্ধে বিক্রয়োত্তর সেবা (After-sales service) এবং ওয়ারেন্টি প্রক্রিয়া নিয়ে চরম অনিয়ম ও প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। পণ্য কেনার পর ওয়ারেন্টি সেবা পেতে গিয়ে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে গ্রাহকদের। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অসংখ্য ভুক্তভোগী তাদের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরছেন, যেখানে উঠে এসেছে ওয়ারেন্টি ক্লেইমের নামে দীর্ঘসূত্রিতা, নষ্ট পণ্য বদলে না দেওয়া এবং নতুনের বদলে রিফারবিশড (পুরোনো/মেরামত করা) পণ্য গছিয়ে দেওয়ার মতো গুরুতর তথ্য।
মেরামতের নামে প্রহসন ও দীর্ঘসূত্রিতা
রায়ান্সের নিজস্ব নীতিমালায় পণ্য মেরামতে ৪ থেকে ৪৫ দিন সময়ের কথা বলা হলেও বাস্তবে তা অনির্দিষ্টকাল গড়াচ্ছে। জাহিদুল হক জাহিদ নামের এক গ্রাহক জানান, গত মাসের ৬ তারিখে মনিটরের পিক্সেল ডেড হয়ে যাওয়ায় তিনি রায়ান্সের ময়মনসিংহ শাখায় জমা দেন। তাকে ৩ সপ্তাহের কথা বলা হলেও ২ মাস পার হতে চললেও মনিটরের কোনো খবর নেই।
মোহাম্মদ তায়েব নামের আরেক ভুক্তভোগী পিসি বিল্ড করার মাত্র দুই দিন পরই মাদারবোর্ডে সমস্যা পান। ওয়ারেন্টির আওতায় প্রথমবার মেরামত করতে ১২ দিন সময় নেয় রায়ান্স। কিন্তু সমস্যাটি আবার দেখা দিলে নতুন মাদারবোর্ড না দিয়ে দ্বিতীয়বারও সেটি মেরামত করেই ফেরত দেওয়া হয়। হতাশ হয়ে তিনি রায়ান্স বয়কটের ডাক দিয়েছেন।
একই অভিজ্ঞতার শিকার সাব্বির হোসেন। তিনি বলেন, “ভুল করে রায়ান্স থেকে রাউটার কিনেছিলাম। দফায় দফায় ৫ বার সার্ভিসিংয়ে দিয়েও সমাধান পাইনি। শেষে রাগে রাউটারটি বাসায় ফেলে রেখেছি।”
নতুনের মোড়কে রিফারবিশড বা ভিন্ন পণ্য
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ হলো—আসল পণ্যের দামে নকল বা রিফারবিশড পণ্য বিক্রি এবং ওয়ারেন্টিতে নিম্নমানের পণ্য দেওয়া। লামিয়া তারান্নুম ঐশী জানান, তিনি প্রায় ১৬ হাজার টাকা দিয়ে স্যামসাংয়ের এসএসডি (SSD) কেনেন। পরে যাচাই করে দেখেন সেটি আসল নয়, রিফারবিশড। ক্ষোভে তিনি পণ্যটি দোকানে ছুড়ে দিয়ে আসেন।
বগুড়া শাখার গ্রাহক ফারদিন রহমান জানান, তিনি নতুন MSI RTX 3060 গ্রাফিক্স কার্ড কেনার দুই মাসের মধ্যে সমস্যায় পড়েন। ওয়ারেন্টিতে দেওয়ার পর তাকে বক্সবিহীন ব্যবহৃত একটি জিপিইউ দেওয়া হয়। বক্স চাইলে কর্মীরা জানান, ‘ইউনিট এভাবেই আসে’। চাপের মুখে পরে তাকে অন্য একটি পুরোনো বক্স দেওয়া হয়।
ফেসবুক ব্যবহারকারী শেখ জামাল অভিযোগ করেন, ওয়ারেন্টিতে দেওয়া এমএসআই (MSI) মনিটরের বদলে তাকে জোর করে আসুস (Asus) মনিটর দেওয়া হয়েছে।
গ্রাহকের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হুমকি
অভিযোগ রয়েছে, গ্রাহকরা তাদের অধিকার নিয়ে কথা বললে বা ভোক্তা অধিকার অধিদপ্তরে যাওয়ার কথা জানালে রায়ান্সের কর্মীরা তা নিয়ে উপহাস করেন। ফারদিন রহমান যখন আইনি ব্যবস্থার কথা বলেন, তখন রায়ান্সের কর্মীরা ঠাট্টা করে বলেন, “মামলা করেন, দেখি কতদিন লাগে।” এছাড়া ফেসবুকে অভিযোগ করে পোস্ট দিলে রায়ান্স কর্তৃপক্ষ তা মুছে দেয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
আরও পড়ুন : স্যামসাংয়ের নকল এসএসডি বিক্রি করছে স্টার টেক
ভোক্তা অধিকার নিয়ে কাজ করা সংগঠন মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিসিএ) সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ এ বিষয়ে বলেন, “ওয়ারেন্টি কোনো দয়া নয়, এটি গ্রাহকের অধিকার। রায়ান্সসহ অনেক প্রতিষ্ঠান বিক্রির সময় লাভ ঠিকই করে, কিন্তু সেবা দেওয়ার সময় নানা অজুহাত দেখায়। গ্রাহক হয়রানি এখন নিয়মে পরিণত হয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে আইনের আওতায় এনে কঠোর জবাবদিহিতার মুখোমুখি করা জরুরি।”
প্রযুক্তি বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, ক্রেতা সন্তুষ্টির জন্য কেবল কম দামই যথেষ্ট নয়। বিক্রয়োত্তর সেবায় স্বচ্ছতা না থাকলে এবং গ্রাহকের সঙ্গে প্রতারণা করা হলে প্রতিষ্ঠানের সুনাম ধূলিসাৎ হতে সময় লাগবে না।






















