যেখানে সরকারি ফাইল নড়তে মাসের পর মাস সময় লাগে, সেখানে শত কোটি টাকার ৫জি প্রকল্প মাত্র দুই কার্যদিবসে চূড়ান্ত করার ‘ম্যাজিক’ দেখিয়েছে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশন্স কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল)। চীনা প্রযুক্তি জায়ান্ট হুয়াওয়েকে কাজ পাইয়ে দিতে নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে নজিরবিহীন তড়িঘড়ি করা হয়েছে বলে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সাম্প্রতিক শ্বেতপত্রে উঠে এসেছে।
সংশ্লিষ্ট নথিপত্র ও শ্বেতপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিটিসিএল-এর ‘৫জি’র উপযোগীকরণে অপটিক্যাল ফাইবার ট্রান্সমিশন নেটওয়ার্ক উন্নয়ন’ প্রকল্পের দরপত্র প্রক্রিয়ায় শুরু থেকেই ছিল নানা অসংগতি। বিশেষ করে কারিগরি ও আর্থিক মূল্যায়নে পিপিআর (PPR) বিধির গুরুতর লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে।
৪৮ ঘণ্টার রহস্যময় মূল্যায়ন: দরপত্র দলিলে আর্থিক প্রস্তাব খোলার জন্য অন্তত ৭ দিনের নোটিশ দেওয়ার বাধ্যবাধকতা থাকলেও মাত্র ৪৮ ঘণ্টার কম সময়ের নোটিশে তা খোলা হয়। এ বিষয়ে অন্য একটি দরদাতা প্রতিষ্ঠান (ZTE) লিখিত আপত্তি জানালেও তা আমলে নেয়নি বিটিসিএল। সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, মাত্র দুই কার্যদিবসের মধ্যে বিশদ মূল্যায়ন প্রতিবেদন জমা দেয় মূল্যায়ন কমিটি, যা কারিগরিভাবে প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
আপত্তি তোলায় এমডিকে পদাবনতি: সূত্র জানায়, তৎকালীন বিটিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আসাদুজ্জামান চৌধুরী এই ত্রুটিপূর্ণ মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় আপত্তি জানিয়েছিলেন এবং পুনরায় দরপত্র আহ্বানের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এর খেসারত হিসেবে তাকে প্রথমে পদাবনতি এবং পরে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল। যদিও পরবর্তীতে আদালতের রায়ে তিনি পুনরায় বহাল হন।
কারিগরি শর্তে ছাড় ও সরঞ্জাম ক্রয়ে নয়ছয়: প্রকল্পের কারিগরি মূল্যায়নে দেখা যায়, হুয়াওয়েসহ অংশগ্রহণকারী কোনো প্রতিষ্ঠানই সব শর্ত পুরোপুরি পূরণ করতে পারেনি। তা সত্ত্বেও সবাইকে রহস্যজনকভাবে ‘যোগ্য’ ঘোষণা করা হয়। এছাড়া বুয়েটের সম্ভাব্যতা যাচাই প্রতিবেদনের তোয়াক্কা না করে প্রয়োজনের চেয়ে কয়েক গুণ বেশি সক্ষমতার সরঞ্জাম কেনা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সরঞ্জাম আমদানির আগে বাধ্যতামূলক কারখানা পরিদর্শন (FPAT) করার জন্য সরকারি আদেশ (GO) জারি হলেও পরবর্তীতে তা রহস্যজনকভাবে বাতিল করা হয়।
প্রকল্পের ব্যয় ও বর্তমান অবস্থা: সম্পূর্ণ সরকারি অর্থায়নে পরিচালিত এই প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছিল ১০৫,৯১০.০০ লক্ষ টাকা। এর মধ্যে হুয়াওয়ের সঙ্গে ২৬.৫৫ মিলিয়ন মার্কিন ডলার এবং ৩১.১০ কোটি টাকার চুক্তি সম্পন্ন হয়। বিটিসিএল-এর এই ‘স্পিডি’ মূল্যায়ন নিয়ে তৎকালীন সময়েই প্রশ্ন তুলেছিল সেন্ট্রাল প্রকিউরমেন্ট টেকনিক্যাল ইউনিট (CPTU)।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ৫জি সেবার নামে সরকারি অর্থের এই নয়ছয় কেবল প্রযুক্তিগত দুর্নীতিই নয়, বরং জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে। শ্বেতপত্র কমিটির প্রতিবেদনে এই প্রকল্পে জড়িত কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।






















