টেলিযোগাযোগ খাতে স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণে শুধু সরকারের এককালীন রাজস্ব আয় নয়, গ্রাহকসেবা, অপারেটরদের ব্যবসায়িক সক্ষমতা ও দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য তৈরির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)।
নিয়ন্ত্রক সংস্থাটির চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী বলেছেন, টেলিকম নীতি ও স্পেকট্রামের দাম নির্ধারণে অনুমাননির্ভর সিদ্ধান্তের বদলে বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে ভিত্তি হিসেবে নেওয়া হবে।
শনিবার রাজধানীর একটি হোটেলে টেলিকম অ্যান্ড টেকনোলজি রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশ (টিআরএনবি) আয়োজিত এক গোলটেবিল বৈঠকে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
আগামী নভেম্বরের বড় পরিসরের স্পেকট্রাম নবায়ন সামনে রেখে কোনো সিদ্ধান্ত একতরফাভাবে না নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে সংবেদনশীলতার সঙ্গে সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান।
বাংলাদেশের নেটওয়ার্ক অবকাঠামোয় স্পেকট্রামের ঘাটতির কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বমান অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ গ্রাহকের জন্য ২ থেকে ৬ মেগাহার্টজ তরঙ্গ প্রয়োজন হলেও বাংলাদেশে এই পরিমাণ ২ দশমিক ২৯ মেগাহার্টজ।
এ ছাড়া দেশে ফিক্সড ব্রডব্যান্ড ব্যবহারের হার ৩৬ শতাংশ হওয়ায় মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
এমদাদ উল বারীর হিসাবে, ২০৩৫ সাল নাগাদ দেশে প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের প্রয়োজন হবে। বর্তমানে ৪৬০ থেকে ৪৬২ মেগাহার্টজ তরঙ্গ ব্যবহৃত হচ্ছে। আগামী বছর আরও প্রায় ৪০০ মেগাহার্টজ তরঙ্গ নিলামে তোলার পরিকল্পনা রয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, ২০১৮ সালের উচ্চমূল্যের স্পেকট্রাম দর পরবর্তী সময়ে একটি স্থায়ী বেঞ্চমার্কে পরিণত হয়েছে। ফলে প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় স্পেকট্রামের দাম কমানোর উদ্যোগ নিলে অডিট আপত্তি ও সরকারি রাজস্ব কমে যাওয়ার অভিযোগের মুখে পড়তে হয়।
সম্প্রতি রবির ইজিএসএম বা ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ড তিন বছরের জন্য বরাদ্দে ১০ থেকে ২৫ শতাংশ মূল্যছাড় দেওয়ার বিষয়ে বিটিআরসির একটি যৌক্তিক প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ের আইনি জটিলতায় আটকে আছে বলেও জানান তিনি।
তাঁর ভাষ্য, স্পেকট্রাম অব্যবহৃত পড়ে থাকলে সরকারের যে বড় ধরনের রাজস্ব ক্ষতি হয়, সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় সেই বিষয়টি যথেষ্ট গুরুত্ব পায় না।
গ্রাহক, অপারেটর ও সরকারের স্বার্থের মধ্যে সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে এমদাদ উল বারী বলেন, বিশ্বমানের তুলনায় বাংলাদেশে ডেটার দাম কম হলেও আঞ্চলিক ক্রয়ক্ষমতার বিবেচনায় তা এখনো গ্রাহকের ওপর চাপ তৈরি করে।
গ্রাহকদের প্রধান চাহিদা নিরবচ্ছিন্ন সেবা এবং কলড্রপমুক্ত নেটওয়ার্ক—এ বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে দেশের মোবাইল অপারেটরগুলোর গড় আয়প্রতি গ্রাহক বা এআরপিইউ কম এবং স্পেকট্রাম ব্যয় বেশি—এমন বাস্তবতায় শুধু তরঙ্গের দাম কমিয়ে দিলেই সেবার মান উন্নত হবে কি না, সেটিও বিবেচনার বিষয় বলে জানান তিনি।
সিম ট্যাক্স কমানোর সুবিধা শেষ পর্যন্ত কতটা গ্রাহকের কাছে পৌঁছেছে, সেই প্রশ্নেরও মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান।
টেলিকম নীতি ও স্পেকট্রামের মূল্য নির্ধারণের ক্ষেত্রে গভীর বৈজ্ঞানিক গবেষণার কোনো বিকল্প নেই বলে মন্তব্য করেন এমদাদ উল বারী।
এ লক্ষ্যেই বিটিআরসি ইতোমধ্যে একটি নিরপেক্ষ গবেষণা দল গঠন করেছে বলে জানান তিনি।
পাশাপাশি প্রত্যন্ত ও অনগ্রসর অঞ্চলে স্পেকট্রামের কার্যকর ব্যবহার বাড়াতে অপারেটরদের জন্য নতুন ধরনের ইনসেন্টিভ ও আর্থিক সুবিধা নীতিতে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
নীতিনির্ধারক, অপারেটর ও গণমাধ্যমকে সমন্বিতভাবে ৩৬০ ডিগ্রি দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বিটিআরসি চেয়ারম্যান বলেন, শেষ পর্যন্ত লক্ষ্য হওয়া উচিত সাধারণ মানুষের জন্য উন্নত টেলিযোগাযোগ সেবা নিশ্চিত করা এবং দেশের ডিজিটালাইজেশন আরও দ্রুত এগিয়ে নেওয়া।
গবেষণার ধারাবাহিকতা বজায় রেখে স্পেকট্রাম ও টেলিকম নীতিতে সর্বোত্তম সিদ্ধান্ত নেওয়ার চেষ্টা করা হবে বলেও জানান তিনি।
টিআরএনবির সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন স্বাগত বক্তব্যে বলেন, সব অপারেটরের মধ্যে স্পেকট্রামের ভারসাম্যপূর্ণ বণ্টন এবং ইজিএসএমের মতো বাস্তব সমস্যাগুলো নিয়ে সঠিক দিকনির্দেশনা পাওয়ার লক্ষ্যেই এই গোলটেবিল বৈঠকের আয়োজন করা হয়েছে।
টিআরএনবি সভাপতি এস এম মাসুদুজ্জামান রবিনের সভাপতিত্বে বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এতে আরও উপস্থিত ছিলেন এমটব সভাপতি ও রবির সিইও জিয়াদ সাতারা, গ্রামীণফোনের সিইও ইয়াসির আজমান, বাংলালিংকের সিইও জোহান বুসে, টেলিকম বিশেষজ্ঞ টিআইএম নুরুল কবির, গ্রামীণফোনের চিফ করপোরেট অ্যাফেয়ার্স অফিসার তানভীর মোহাম্মদ, বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অফিসার তাইমুর রহমান, রবির কোম্পানি সচিব সাহেদ আলম, এমটব মহাসচিব মো. জুলফিকার এবং ফিকির নির্বাহী পরিচালক নুরুল কবিরসহ সংশ্লিষ্টরা।




















