দেশের টেলিযোগাযোগ খাতে বড় ধরনের সংস্কার এনে উপদেষ্টা পরিষদ ‘টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং নীতি, ২০২৫’ অনুমোদন দিয়েছে । সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, এই নীতির মাধ্যমে এ খাতের মধ্যস্বত্বভোগীদের ‘মাফিয়াতন্ত্র’ বিলোপ হবে এবং সাধারণ গ্রাহকরা সুলভ মূল্যে উন্নত সেবা পাবেন । তবে, সরকারের এই উদ্যোগকে ‘দেশীয় উদ্যোক্তাদের ধ্বংস করে বিদেশিদের হাতে ব্যবসা তুলে দেওয়ার ষড়যন্ত্র’ হিসেবে আখ্যায়িত করে এর তীব্র বিরোধিতা করছেন খাতটির সঙ্গে জড়িত মধ্যস্বত্বভোগী দেশীয় ব্যবসায়ীরা ।
সরকারি ভাষ্য: ‘মাফিয়াতন্ত্রের’ অবসান
সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, উপদেষ্টা ড. ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদের বরাত দিয়ে বলেন, “লাইসেন্সিংয়ের জন্য মধ্যস্বত্বভোগীরা একটা মাফিয়াতন্ত্রের মাধ্যমে এই সেবা খাত নিয়ন্ত্রণ করত। এর খরচটা পড়ত সাধারণ মানুষের ওপরে, আর এই টাকাটা যেত শেখ হাসিনার লোকদের পকেটে। নতুন নীতিমালায় এই মাফিয়াতন্ত্রটা বিলোপ হবে।” । তিনি আরও জানান, এই নীতির ফলে গেটওয়ের ওপর মাফিয়াদের নিয়ন্ত্রণ বন্ধ হবে, খাতে সার্বিক খরচ কমবে এবং বিনিয়োগ বাড়বে ।
ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব জানান, পুরনো ২৬ ধরনের লাইসেন্সের আওতায় প্রায় ৩ হাজার প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দিয়ে যে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হয়েছিল, তা বিটিআরসির পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছিল না । তিনি বলেন, এই পলিসি থেকে মধ্যস্বত্বভোগী স্তর সরিয়ে আমরা ৩টি স্তরে নিয়ে এসেছি। এছাড়া স্যাটেলাইট টেলিযোগাযোগ সেবার জন্য আরেকটি লাইসেন্সিং পদ্ধতি রেখেছি। অর্থাৎ মোট ৪টি স্তরে কাজ হবে। এর মাধ্যমে সেবার মান নিশ্চিত করে মোবাইল ডেটা ও মিনিটের দাম মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনার পরিকল্পনা করা হয়েছে । এই নীতিমালার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে যারা ব্যবসা করেন তাদেরকে সেবার মানের নিশ্চিয়তা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সরকারের এই উদ্যোগকে তীব্র সন্দেহের চোখে দেখছেন দেশীয় মধ্যস্বত্বভোগী ব্যবসায়ীরা । তাদের অভিযোগ, নতুন এই নীতিমালায় দেশীয় ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের হুমকির মুখে ফেলে বিদেশি কোম্পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে ।
তারা আরও অভিযোগ করেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ফসল হিসেবে ক্ষমতার চেয়ারে বসা অন্তর্বর্তী সরকারের করা নতুন নীতিমালায় বৈষম্যমূলক অনেক ধারা রয়েছে। দেশীয় উদ্যোক্তাদের প্রাধান্য না দিয়ে কার স্বার্থে এই নীতিমালা করা হচ্ছে, তা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা ।
তবে দেশের শীর্ষ মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন এই নীতিমালাকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে । অপারেটরটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, “আমরা বিশ্বাস করি এটি এই খাতের জন্য উপকারী হবে। একই সাথে আমরা সরকারকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব বাস্তবসম্মত নীতিমালা চূড়ান্ত করে প্রকাশ করার আহ্বান জানাই, কারণ এটি কার্যকর বাস্তবায়নের জন্য সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ।” ।
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমান লাইসেন্সিং পদ্ধতিতে মধ্যসত্ত্বভোগী ব্যবস্থা রহিত করে আধুনিক ও যুগোপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। এই নীতিমালার মাধ্যমে টেলিযোগাযোগ খাতে যারা ব্যবসা করেন তাদেরকে সেবার মানের নিশ্চিয়তা দিতে বাধ্য হবে। টেলিকমিউনিকেশনস নেটওয়ার্ক অ্যান্ড লাইসেন্সিং নীতি, ২০২৫বাস্তবায়ন হলে আরও কোম্পানি আসতে পারে এবং প্রতিযোগিতা বাড়াতে পারে সেই বিষয়গুলো আমরা নতুন নীতিমালায় নিশ্চিত করা হয়েছে। এর ফলে আগের চেয়ে বেশি প্রতিযোগিতা হবে এবং গ্রাহকরা কম মূল্যে সেবা পাবে। তবে দেশি কিছু মাফিয়া ব্যবসায়ী এই নীতি কতটা বাস্তবায়ন করতে দেবে সেটা দেখার বিষয়।
গত ২০ জুলাই এই নীতিমালার খসড়া পর্যালোচনার জন্য পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদকে সভাপতি করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছিল সরকার । সেই কমিটির পর্যালোচনার পরই নীতিমালাটি চূড়ান্তভাবে অনুমোদন দেওয়া হলো ।






















