প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য সাশ্রয়ী মোবাইল সংযোগ ও ডিজিটাল সেবা দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে নিউইয়র্কে যাত্রা শুরু করে মোবাইল ভার্চুয়াল নেটওয়ার্ক অপারেটের (এমভিএনও) রিভারটেল হোল্ডিংস। কয়েক বছরের মধ্যেই সম্ভাবনাময় উদ্যোগ হিসেবে পরিচিতিও লাভ করে স্টার্টআপটি। কমিউনিটি-ভিত্তিক ব্যবসা, বিনিয়োগকারীদের আস্থা ও দ্রুত গ্রাহক বৃদ্ধির কারণে সফল স্টার্টআপ হিসেবে পরিচিত পায় রিভারটেল। প্রাথমিক পর্যায়ে প্রবাসী কয়েকজন বিনিয়োগকারী যৌথ মূলধনে গড়ে উঠলেও পরবর্তীতে এর অ্যানুয়াল রিকারিং রেভিনিউ (এআরআর) হয় প্রায় ১ কোটি মার্কিন ডলার। কিন্তু ব্যবসায়িক লক্ষ্যপূরণের আগেই একক নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত মুনাফা, স্বেচ্ছাচারী সিদ্ধান্ত ও গুরুতর আর্থিক অনিয়মের কারণে প্রায় বন্ধ হওয়ার মুখে সম্ভাবনাময় এ প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ নথি, আর্থিক হিসাব ও বোর্ড বৈঠকের রেকর্ড বিশ্লেষণে সামনে এসেছে অর্থপ্রবাহ, বিনিয়োগ কাঠামো ও করপোরেট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নানা প্রশ্ন। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন রিভারটেলের সাবেক প্রধান নির্বাহী রুহিন হোসাইন। যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে তার বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম ও বিনিয়োগ সংক্রান্ত প্রতারণার অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানের রাজস্ব ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় শুরু থেকেই বড় অংশ এককভাবে রুহিন হোসাইনের নিয়ন্ত্রণে ছিল; বোর্ডের পূর্ণাঙ্গ তদারকির বাইরে ছিল গ্রাহক বিলিং, বিনিয়োগ এবং নগদ অর্থের হিসাব। এতে করে দীর্ঘমেয়াদে প্রতিষ্ঠানটি ঝুঁকিতে পরে, আর্থিক স্বচ্ছতাও নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে যায়।
শেয়ারহোল্ডারদের চুক্তি অনুযায়ী পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি ছাড়া বড় অঙ্কের অর্থ ব্যয়, নির্বাহীদের বেতন নেয়া ও নতুন বিনিয়োগ গ্রহণে সীমাবদ্ধতা ছিল। কিন্তু দেওয়ানি মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই এই শর্তের ব্যত্যয় ঘটে। পরিচালনা পর্ষদের অনুমোদন ছাড়াই প্রধান নির্বাহীর বেতন নির্ধারণ ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব থেকে ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে অর্থ স্থানান্তরের মত ঘটনা ঘটে। পাশাপাশি, প্রতিষ্ঠানের হিসাবরক্ষণে স্বচ্ছতা নিশ্চিতে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। উপরন্তু, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য শেয়ারহোল্ডারদের নিয়ে গঠিত পরিচালনা পর্ষদ উপেক্ষা করে বোর্ডের কাঠামো, শেয়ার বণ্টন ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন আনা হয়। আর এসব অনিয়মে অভিযোগের তীর সাবেক সিইও রুহিন হোসাইনের দিকে।
একজন বিনিয়োগকারীর ক্ষেত্রে দেখা যায়, তিনি কয়েক ধাপে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করলেও তা প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে না জমা হয়ে, জমা হয় ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে। পরবর্তী সময়ে সেই অর্থকে কখনও শেয়ারে বিনিয়োগ, কখনও ব্যক্তিগত ঋণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়।
পতনের শুরু যেভাবে
জানা গেছে, শুরুতে লাইসেন্স নেওয়া, সেবার সম্প্রসারণ ও গ্রাহক সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনা থাকলেও সাবেক সিইওর স্বেচ্ছাচারী আচরণ ও আর্থিক অনিয়ম বাড়ার সাথে প্রতিষ্ঠানের পরিচালন ব্যয় নির্বাহে ঝুঁকি তৈরি হয়; বকেয়া পরে বিশাল অঙ্কের ভেন্ডর ও সাপ্লায়ারদের বিল এবং বাতিল হতে থাকে টেলিকম অপারেটরদের সাথে করা চুক্তি। এর ফলে, দ্রুত কমে যেতে থাকে প্রতিষ্ঠানের আয়, ঝামেলা হয় ব্যাংক অ্যাকাউন্টে এবং অনিয়মিত হয়ে যায় কর্মীদের বেতন।
অন্যদিকে, প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরীণ আর্থিক নথিতে দেখা যায়, বোর্ড অনুমোদন ছাড়াই প্রধান নির্বাহীর বেতন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়। একই সময়ে প্রতিষ্ঠানের নামে অতিরিক্ত ঋণ নেওয়া হয়, যে বিষয়ে বোর্ডকে জানানো হয়নি বলে দাবি করেন। শেয়ারহোল্ডাররা। করপোরেট কার্ডের মাধ্যমে ব্যক্তিগত ব্যয়, পারিবারিক খরচ এবং ব্যক্তিগত দায় পরিশোধের অভিযোগও উঠেছে রুহিন হোসাইনের বিরুদ্ধে।
আরও একটি বিষয়ে নিরীক্ষকেরা প্রশ্ন তুলেছেন: প্রতিষ্ঠানের হিসাবে হঠাৎ বড় অঙ্কের অর্থ জমা পড়ে, যা সাবেক সিইও নিজের বিনিয়োগ বলে দাবি করেন। কিন্তু লেনদেনের ধরণ বিশ্লেষণে সন্দেহ করা হচ্ছে, এগুলো আসলে গ্রাহক রাজস্বের অংশ, যা আগে ব্যক্তিগত হিসাবে জমা হয় এবং পরবর্তীতে আংশিকভাবে প্রতিষ্ঠানের অ্যাকাউন্টে জমা দেখানো হয়। বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠানটির নামে পৃথক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগও রয়েছে, যা মূল মার্কিন প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন নয় এক্ষেত্রে, বেতন প্রদানের তালিকায় এমন ব্যক্তিদের নাম পাওয়া গেছে, যারা বাস্তবে প্রতিষ্ঠানের জন্য কাজ করেননি, এমন অভিযোগও করেন রিভারটেলের বিনিয়োগকারীরা।
রিভারটেলের অর্থে অন্য মিডিয়া প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম আরও অভিযোগ আছে, রুহিন হোসাইন রিভারটেলের অর্থে অন্য একটি ডিজিটাল মিডিয়া চালু করেন এবং এর কার্যক্রম পরিচালনা করেন। এতে করপোরেট স্বার্থের সংঘাত, স্বজনপ্রীতি এবং প্রতিষ্ঠানের সম্পদের অপব্যবহারের প্রশ্ন উঠেছে। দেওয়ানি মামলার অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, সংকটাপন্ন সময়েও রিভারটেলের অর্থে ওই ডিজিটাল মিডিয়ার অফিস ভাড়া ও কর্মীদের বেতন পরিশোধ করা হয়, অথচ এ ব্যাপারে কিছুই জানানো হয়নি রিভারটেলের বিনিয়োগকারীদের।
বোর্ডের সদস্যদের অভ্যন্তরীণ বার্তা ও ই-মেইলেও প্রধান নির্বাহীর আর্থিক অব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। বোর্ডের একাধিক বৈঠকে আর্থিক অনিয়ম নিয়ে আলোচনা হয় এবং তৃতীয় পক্ষের নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়। পরবর্তীতে, রুহিন হোসাইনকে প্রধান নির্বাহীর পদ থেকে অপসারণ করা হয়।
বিভিন্ন নথিসহ প্রাথমিক তথ্যের বিশ্লেষণে রুহিন হোসাইনের বিরুদ্ধে বিনিয়োগ নিয়ে সুপরিকল্পতভাবে ভুল তথ্যের উপস্থাপন, করপোরেট তহবিলের অপব্যবহার, বোর্ড অনুমোদন ছাড়া ঋণ গ্রহণ ও বেতন নির্ধারণ এবং প্রতিষ্ঠানের অর্থ ও কর্মীদের ব্যক্তিস্বার্থে ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া যায়। নথিপত্রে বর্ণিত অর্থপ্রবাহ, বোর্ড রেকর্ড ও নিরীক্ষা পর্যবেক্ষণে করপোরেট ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের অনিয়মের ইঙ্গিত রয়েছে। যদিও, অভিযোগগুলো এখনও আদালতে প্রমাণিত হয়নি; তবে এসব অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল ও অঙ্গরাজ্য আইনের আওতায় রুহিন হোসাইনের বিরুদ্ধে দেওয়ানি ও ফৌজদারি মামলা হতে পারে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।





















