দেশের নন-লাইফ বীমা খাতে মোটর বীমা ইস্যুর ক্ষেত্রে ট্যারিফ ও বিধিমালা লঙ্ঘন করে অনৈতিকভাবে ‘নো ক্লেইম বোনাস’ (এনসিবি) সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অন্তত ১৮টি বীমা কোম্পানির বিরুদ্ধে। নিয়ম ভেঙে নতুন পলিসিতেই ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দিয়ে সরকারি রাজস্ব ফাঁকি এবং বাজারে অসুস্থ প্রতিযোগিতা তৈরির প্রমাণ মিলেছে।
আইন কী বলে?
বীমা বিধিমালা অনুযায়ী, ‘নো ক্লেইম বোনাস’ বা এনসিবি কেবলমাত্র তখনই প্রযোজ্য যখন কোনো গ্রাহক পূর্ববর্তী বছরে বীমা দাবি (Claim) পেশ করেননি। অর্থাৎ, এটি কেবল দ্বিতীয় বা পরবর্তী বছরের নবায়নের সময় পাওয়ার যোগ্য। নতুন গাড়ির বীমার ক্ষেত্রে বা প্রথম বছরে এই ছাড় দেওয়ার কোনো আইনগত সুযোগ নেই।
শীর্ষ কোম্পানিগুলোর অনিয়ম
বীমা দলিল ও প্রিমিয়াম জমার রশিদ পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স, বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স এবং গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্সসহ একাধিক কোম্পানি এই অনিয়মে জড়িয়েছে।
ইউনিয়ন ইন্স্যুরেন্স: এই কোম্পানির অন্তত ছয়টি পলিসিতে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত বিধিবহির্ভূত এনসিবি দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। ডেমরার জনৈক গ্রাহকের ৪০ লাখ টাকার পলিসিতে প্রথম বছরই ৩০ শতাংশ ছাড় দেওয়া হয়। গুলশান ও দিলকুশা শাখা থেকে ইস্যু করা একাধিক পলিসিতে রেকর্ড ৫০ শতাংশ ছাড়ের তথ্য মিলেছে।
বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স: শান্তিনগর ও গুলশানসহ বিভিন্ন শাখা থেকে ইস্যু করা অন্তত পাঁচটি পলিসিতে ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ অবৈধ এনসিবি দেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, প্রথম বছরে এই সুবিধা দেওয়া নিয়মসিদ্ধ নয়।
গ্লোবাল ইন্স্যুরেন্স: কমলাপুর শাখা থেকে ইস্যু করা পাঁচটি পলিসিতে ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাঞ্চ ইনচার্জ ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে মন্তব্য এড়িয়ে যান।
তালিকাভুক্ত অন্যান্য কোম্পানি
তদন্তে আরও দেখা গেছে, এশিয়া প্যাসিফিক জেনারেল ইন্স্যুরেন্স চারটি এবং প্রাইম ও রূপালী ইন্স্যুরেন্স যথাক্রমে তিনটি ও দুটি পলিসিতে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত অবৈধ বোনাস দিয়েছে। এছাড়া গ্রিন ডেল্টা, ফেডারেল, প্রগতি, রিলায়েন্স, ইসলামী, নিটল, ইউনাইটেড, ফিনিক্স, সোনার বাংলা এবং রিপাবলিক ইন্স্যুরেন্সের বিরুদ্ধেও অন্তত একটি করে পলিসিতে এই অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শাস্তির বিধান ও বিশেষজ্ঞ মত
আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ভুয়া এনসিবি প্রদান বীমা আইন ২০১০-এর ধারা ৪৯ অনুযায়ী রিবেট বা কমিশন নিষিদ্ধকরণের স্পষ্ট লঙ্ঘন। এই অপরাধের জন্য ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং অনিয়ম অব্যাহত থাকলে প্রতিদিনের জন্য অতিরিক্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। গুরুতর ক্ষেত্রে লাইসেন্স বাতিল বা কর্মকর্তাদের অপসারণের সুযোগও আইনে রয়েছে।
বীমা খাতের বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইডিআরএ-র (IDRA) দুর্বল নজরদারির সুযোগ নিয়ে কোম্পানিগুলো এই অসুস্থ প্রতিযোগিতায় লিপ্ত হয়েছে। এতে সৎ কোম্পানিগুলো বাজারে টিকতে পারছে না এবং সরকার বড় অঙ্কের ভ্যাট ও ট্যাক্স হারাচ্ছে। দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা না নিলে পুরো বীমা খাত আস্থার সংকটে পড়বে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তারা।




















