বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ মোবাইল ফোন বাজার হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে স্মার্টফোন ও টেলিযোগাযোগ সেবায় উচ্চ কর ডিজিটাল অন্তর্ভুক্তির পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন খাতসংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, উদ্যোক্তা ও নীতিনির্ধারকেরা। তাদের মতে, উচ্চমূল্যের কারণে এখনো দেশের বিপুল জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সুবিধার বাইরে রয়ে গেছে।
রোববার বিশ্ব টেলিযোগাযোগ ও তথ্য সমাজ দিবস ২০২৬ উপলক্ষে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) কার্যালয়ে আয়োজিত সেমিনারে এসব কথা উঠে আসে। ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় দিনব্যাপী কর্মসূচির আয়োজন করে। এবারের প্রতিপাদ্য ছিল—‘ডিজিটাল লাইফলাইন: স্ট্রেংদেনিং রেজিলিয়েন্স ইন অ্যা কানেক্টেড ওয়ার্ল্ড’।
সেমিনারে বক্তারা বলেন, ডিজিটাল অর্থনীতি, স্মার্ট গভর্নেন্স ও প্রযুক্তিনির্ভর কর্মসংস্থানের কথা বলা হলেও বাস্তবে দেশের নিম্ন ও মধ্যআয়ের জনগোষ্ঠীর জন্য এখনো স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট অনেক ক্ষেত্রে বিলাসিতার পর্যায়ে রয়ে গেছে। ফলে ডিজিটাল বৈষম্য কমানোর পরিবর্তে নতুন করে বৈষম্য তৈরি হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
‘একটি স্মার্টফোন কিনতেই মাসিক আয়ের ২৫ শতাংশ’
ভয়েস ফর রিফর্মের সমন্বয়ক ও বিডিজবসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা এ কে এম ফাহিম মাশরুর বলেন, বর্তমানে ডিজিটাল অংশগ্রহণ সম্প্রসারণের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হচ্ছে সাশ্রয়ী মূল্যে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেট সেবা নিশ্চিত করা।
তিনি বলেন, “অনেক ক্ষেত্রেই একটি সাধারণ স্মার্টফোন কিনতে একজন মানুষের মাসিক আয়ের প্রায় ২৫ শতাংশ ব্যয় হয়ে যায়। অথচ এখন শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, অনলাইন প্রশিক্ষণ, ফ্রিল্যান্সিং ও দক্ষতা উন্নয়নের জন্য স্মার্টফোন অপরিহার্য।”
তার মতে, দেশে ডিজিটাল রূপান্তর বাস্তবায়ন করতে হলে প্রথমেই স্মার্টফোন ও ডাটা সেবাকে মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে আনতে হবে।
কর কমানোর সুপারিশ বিটিআরসির
সেমিনারে বিটিআরসির মহাপরিচালক আমিনুল ইসলাম বলেন, টেলিযোগাযোগ খাতে করের চাপ কমানোর বিষয়ে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি একাধিকবার সরকারের কাছে সুপারিশ করেছে। তবে এই খাত থেকে সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হওয়ায় তাৎক্ষণিকভাবে কর কমানো কঠিন হয়ে পড়েছে।
তিনি বলেন, “বিকল্প রাজস্ব উৎস তৈরি করা গেলে ভবিষ্যতে টেলিযোগাযোগ সেবার ওপর কর কমানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে।”
খাতসংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে স্মার্টফোন, মোবাইল ইন্টারনেট ও টেলিযোগাযোগ সেবার ওপর বিভিন্ন স্তরে ভ্যাট, সম্পূরক শুল্ক ও কর আরোপ করা হয়েছে। এর ফলে সেবার চূড়ান্ত মূল্য বেড়ে যাচ্ছে, যার চাপ পড়ছে সাধারণ গ্রাহকের ওপর।
‘ডিজিটাল অর্থনীতির জন্য প্রয়োজন সাইবার নিরাপত্তাও’
রবি আজিয়াটা লিমিটেডের করপোরেট ও রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স বিভাগের প্রধান শাহেদ আলম বলেন, শুধু সাশ্রয়ী সেবা নিশ্চিত করলেই হবে না, একই সঙ্গে শক্তিশালী সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
তার ভাষায়, “ডিজিটাল অর্থনীতি সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে সাইবার ঝুঁকিও বাড়ছে। তাই নিরাপদ ডিজিটাল অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।”
‘ডিজিটাল সংযোগ এখন অর্থনীতির চালিকাশক্তি’
অনুষ্ঠানে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা ফকির মাহবুব আনাম বলেন, ডিজিটাল সংযোগ এখন আর শুধু যোগাযোগ অবকাঠামোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থানের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
তিনি জানান, সরকার কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার, বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও), ডেটা সেন্টার ও সাইবার নিরাপত্তা খাতে বিনিয়োগ বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করছে।
‘শীর্ষ ২০ ডিজিটাল অর্থনীতির লক্ষ্য’
প্রধানমন্ত্রীর আইসিটি ও টেলিযোগাযোগবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ২০ ডিজিটাল অর্থনীতির একটি হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্য রয়েছে সরকারের। পরবর্তী এক দশকে শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যেও জায়গা করে নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
তিনি জানান, সরকার ‘ওয়ান ডিজিটাল আইডি’ ও ‘ওয়ান ডিজিটাল ওয়ালেট’ চালুর উদ্যোগ নিয়েছে। পাশাপাশি আগামী ১৫ দিনের মধ্যে ‘ইনোভেশন হান্ট’ কর্মসূচি এবং ৩০ থেকে ৬০ দিনের মধ্যে স্টার্টআপ অনুদান কর্মসূচি চালুর পরিকল্পনা রয়েছে।
আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “ব্রডব্যান্ড ও ডাটা ব্যবহারে ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ঘটলে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ১ থেকে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে।”
‘গ্রাহক বেশি, সেবার মানে পিছিয়ে’
রেহান আসিফ আসাদ আরও বলেন, মোবাইল গ্রাহক সংখ্যার দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে থাকলেও সেবার মান, নির্ভরযোগ্যতা ও সাশ্রয়ী মূল্যের ক্ষেত্রে এখনো অনেক আঞ্চলিক দেশের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে।
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মো. এমদাদ উল বারী বলেন, টেলিগ্রাফ থেকে শুরু করে রেডিও ও ইন্টারনেট—প্রতিটি প্রযুক্তিগত পরিবর্তন সমাজ ও অর্থনীতিকে বদলে দিয়েছে। তিনি তরুণ উদ্ভাবকদের বাস্তব সমস্যার সমাধানে প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবনের আহ্বান জানান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডিজিটাল বাংলাদেশ বাস্তবায়নের পরবর্তী ধাপে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে—সবার জন্য সাশ্রয়ী স্মার্টফোন ও নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট নিশ্চিত করা। অন্যথায় প্রযুক্তিগত অগ্রগতির সুফল সমাজের একটি অংশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যেতে পারে।





















