কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতে পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইবিএম। বিষয়টি স্বীকারও করেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) অরবিন্দ কৃষ্ণ। স্বীকারোক্তির পর পরই শেয়ারবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়ে শতবর্ষী মার্কিন প্রযুক্তি জায়ান্টটি। খবর ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস।
সিইও অরবিন্দের মন্তব্যের পর কোম্পানির বাজারমূল্য একদিনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন বা ৭ হাজার কোটি ডলার কমে গেছে। একই সঙ্গে শেয়ারদর নেমেছে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। শেয়ারবাজারের ইতিহাসে এটি ১৯৬৮ সালের পর আইবিএমের জন্য একক দিনে সবচেয়ে বড় পতনের রেকর্ড।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কভিত্তিক আইবিএম দীর্ঘদিন ধরে বড় বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও সরকারি সংস্থাকে মেইনফ্রেম কম্পিউটার, এন্টারপ্রাইজ সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তিবিষয়ক পরামর্শ সেবা দিয়ে আসছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের কারণে গ্রাহকদের ব্যয়ের ধরনে বড় পরিবর্তন এসেছে। সে পরিবর্তনের সঙ্গে কোম্পানিটি দ্রুত মানিয়ে নিতে পারেনি বলে জানান সিইও।
বিনিয়োগকারীদের কাছে পাঠানো বার্তায় অরবিন্দ কৃষ্ণ বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি বর্তমান বিশ্বজুড়ে চলমান এআই বিপ্লবের মধ্যে যথেষ্ট দ্রুত পদক্ষেপ নিতে পারেনি। ফলে কয়েকটি বড় ব্যবসায়িক চুক্তি প্রত্যাশা অনুযায়ী সম্পন্ন হয়নি। এসব কারণে চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকের (এপ্রিল-জুন) আয়ে উল্লেখযোগ্য নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।’
এরপর মঙ্গলবার আইবিএমের শেয়ারদর একদিনে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত কমে যায়। ১৯৮৭ সালের শেয়ারবাজার ধসের সময় কোম্পানিটির শেয়ার ২৩ দশমিক ৭ শতাংশ কমেছিল। এবার সে রেকর্ডও ভেঙে গেছে।
অরবিন্দ কৃষ্ণ জানান, জুনের শেষ কয়েক সপ্তাহে অনেক গ্রাহক মূলধনি ব্যয়ের অগ্রাধিকার বদলে ফেলেন। তারা সফটওয়্যার বা অন্যান্য প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ না করে এআই সার্ভার, স্টোরেজ ও মেমোরি কেনায় বেশি অর্থ ব্যয় করেন। গ্রাহকরা যে এত বড় পরিসরে সফটওয়্যার থেকে সরে এআই অবকাঠামোয় ব্যয় বাড়াবেন, তা কোম্পানির ধারণার বাইরে ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, এআই প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের ফলে কোম্পানিগুলো এখন সীমিত বাজেটের বড় অংশ ব্যয় করছে সার্ভার, চিপ, নেটওয়ার্কিং যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য এআই অবকাঠামোয়। ফলে প্রচলিত সফটওয়্যার ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবায় তুলনামূলকভাবে কম অর্থ ব্যয় হচ্ছে। আইবিএমের ওপর এর প্রভাব পড়েছে সবচেয়ে বেশি। কারণ প্রতিষ্ঠানটি গ্রাহকদের পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে দ্রুত খাপ খাওয়াতে পারেনি।
বিশেষ করে চাপে পড়েছে আইবিএমের মেইনফ্রেম ব্যবসা। এ খাত থেকে ব্যাংক, উড়োজাহাজ সংস্থা ও বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার ও সফটওয়্যার সরবরাহ করা হয়।
অরবিন্দ কৃষ্ণ আরো বলেন, ‘এআই প্রযুক্তির কারণে সাইবার হামলা আরো জটিল হয়ে উঠছে। ফলে অনেক প্রতিষ্ঠান এখন সাইবার নিরাপত্তা খাতে ব্যয় বাড়াচ্ছে। পাশাপাশি প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগের অগ্রাধিকারও বদলে যাচ্ছে। তিনি উদাহরণ হিসেবে অ্যানথ্রোপিকের ‘মিথোস’ মডেলের কথা উল্লেখ করেন, যা বিদ্যমান সফটওয়্যার ও এনক্রিপশন ব্যবস্থার দুর্বলতা শনাক্ত করতে সক্ষম বলে দাবি করা হয়। আইবিএমের জন্য এ পরিস্থিতিকে ‘খারাপ সময়’ বলে মন্তব্য করেছেন বাজার বিশ্লেষকরা।
চলতি বছরের দ্বিতীয় প্রান্তিকে (এপ্রিল-জুন) কোম্পানিটি ১ শতাংশ আয় প্রবৃদ্ধি আশা করছে। গত এক দশকেরও বেশি সময়ের মধ্যে এটি আইবিএমের সবচেয়ে দুর্বল প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস। একই সঙ্গে ওয়াল স্ট্রিটের বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসের তুলনায় প্রায় ৬৬ কোটি ডলার কম।
বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান আইজি গ্রুপের প্রধান বাজার বিশ্লেষক ক্রিস বিউচ্যাম্প রয়টার্সকে বলেন, ‘আইবিএম ও সফটওয়্যার খাতের জন্য এটি একটি কঠিন সময়। এখন বড় প্রশ্ন হলো, এআই অবকাঠামো ও সাইবার নিরাপত্তায় অতিরিক্ত ব্যয়ের প্রবণতা কতদিন থাকবে। কয়েক মাসের বেশি সময় ধরে এটি চলতে থাকলে সফটওয়্যার কোম্পানিগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে ফের প্রশ্ন উঠবে।’
বিনিয়োগকারীদের আশ্বস্ত করতে ও বাজারের আস্থা ফিরিয়ে আনতে আইবিএম এখন ভবিষ্যৎ প্রযুক্তির পরিকল্পনাগুলো সামনে নিয়ে আসছে। মঙ্গলবার ধসের পর কোম্পানির পক্ষ থেকে কোয়ান্টাম কম্পিউটিং খাতে বিপুল বিনিয়োগের বিষয়টি জোর দিয়ে তুলে ধরা হয়। ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের প্রথম বড় আকারের বাণিজ্যিক কোয়ান্টাম কম্পিউটার তৈরির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে আইবিএম। মেগা প্রজেক্টটি বাস্তবায়নে ১ হাজার কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ করার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, কোয়ান্টাম কম্পিউটিং ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আইবিএমের এআই অংশীদারত্ব এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। এসব উদ্যোগ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে এমন আয় আসছে না, যা কোম্পানির মূল সফটওয়্যার ও অবকাঠামো ব্যবসার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে সহায়তা করবে।
প্রতিবেদন বলছে, বিনিয়োগকারীদের নজর থাকবে এখন কোম্পানির দ্বিতীয় প্রান্তিকের আর্থিক ফলাফলের দিকে। আগামী ২২ জুলাই আইবিএম এ ফল প্রকাশ করবে।
রয়টার্সের প্রতিবেদন ও লন্ডন স্টক এক্সচেঞ্জ গ্রুপের (এলএসইজি) ডেটা অনুযায়ী, কোম্পানিটির দ্বিতীয় প্রান্তিকের আয় প্রায় ১ হাজার ৭২০ কোটি ডলার হতে পারে। অন্যদিকে বিশ্লেষকদের গড় পূর্বাভাস ১ হাজার ৭৮৬ কোটি ডলার।

















