নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের চড়া মূল্যস্ফীতির বাজারে এবার মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের জন্য বড় দুশ্চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে স্মার্টফোনের লাগামহীন মূল্যবৃদ্ধি। বৈশ্বিক চিপ সংকট, মেমোরি মডিউলের সরবরাহ ঘাটতি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে কাঁচামালের দাম বাড়ার অজুহাতে দেশের বাজারে মোবাইল ফোনের দাম এখন আকাশচুম্বী। এর ফলে তথ্যপ্রযুক্তির এই যুগে এসে শিক্ষা, কর্মসংস্থান বা দৈনন্দিন যোগাযোগের জন্য একটি প্রয়োজনীয় ডিজিটাল ডিভাইস কিনতে গিয়ে রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন সাধারণ মানুষ।
বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইন্ডাস্ট্রি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন (MIOB)-এর সভাপতি ও এডিসন গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকারিয়া শহীদ দেশের প্রযুক্তি বাজারের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের চিত্র তুলে ধরে জানান, বিশ্ববাজারে চিপসেট, মাদারবোর্ড, ডিসপ্লে প্যানেল এবং মেমোরির দাম ক্রমাগত বাড়ার কারণে হ্যান্ডসেটের উৎপাদন ও আমদানি খরচ রেকর্ড পরিমাণে বেড়ে গেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, “যে স্মার্টফোনগুলো আগে দেশের সাধারণ ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত ক্রেতারা ৬ থেকে ৮ হাজার টাকার মধ্যে অনায়াসে কিনতে পারতেন, বর্তমান বাজারে সেগুলোর দাম প্রায় দ্বিগুণ বা ডাবল হয়ে গেছে।”
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে বাজারে মধ্যবিত্তের বাজেটের মধ্যে থাকা ১৫ থেকে ২৫ হাজার টাকার ‘লো-এন্ড’ বা এন্ট্রি লেভেলের স্মার্টফোনগুলোর সংকট সবচেয়ে বেশি। কারণ এই সেগমেন্টের ফোনের জন্য অপরিহার্য ৩/৬৪ জিবি বা ৪/৬৪ জিবি মেমোরি চিপের চরম আন্তর্জাতিক ঘাটতি চলছে। ফলে কোম্পানিগুলো চাহিদামতো সাশ্রয়ী ফোন বাজারে সরবরাহ করতে পারছে না।
ভোক্তা অধিকার এবং তথ্যপ্রযুক্তি নিয়ে কাজ করা কর্মীরা বলছেন, বর্তমান বাংলাদেশে শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, মোবাইল ব্যাংকিং, রাইড শেয়ারিং এবং দৈনন্দিন নাগরিক সেবা গ্রহণের জন্য স্মার্টফোন এখন আর কোনো বিলাসী পণ্য নয়, বরং অত্যন্ত ব্যবহারিক ও মৌলিক একটি ডিভাইস। কিন্তু বাজারের এই চড়া মূল্যের কারণে সাধারণ ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো তাদের সন্তানদের অনলাইন পড়াশোনা বা নিজেদের উপার্জনের কাজের জন্য নতুন ফোন কিনতে পারছে না। এভাবে দাম বাড়তে থাকলে দেশের একটি বিশাল জনগোষ্ঠী ডিজিটাল সেবার আওতার বাইরে চলে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, যা সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রাকে মন্থর করে দিতে পারে।
বাজার বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু বৈশ্বিক সংকটই নয়, দেশের বাজারে ট্যাক্স বা করের উচ্চ হারও ফোন দামি হওয়ার অন্যতম কারণ। এই পরিস্থিতি থেকে ক্রেতাদের স্বস্তি দিতে এবং দেশীয় উৎপাদন শিল্পকে বাঁচাতে এমআইওবি (MIOB) ও টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের (বিটিআরসি) মধ্যে ট্যাক্স কাঠামো যৌক্তিক করার আলোচনা চলছে।
উদ্যোক্তাদের মতে, বাজারে অবৈধ বা চোরাই হ্যান্ডসেটের (গ্রে মার্কেট) আধিপত্য বন্ধ করে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (NEIR) পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর করা গেলে এবং বৈধ ফোনের ওপর করের বোঝা কিছুটা কমানো হলে স্থানীয় ম্যানুফ্যাকচারাররা উৎপাদন বাড়িয়ে হ্যান্ডসেটের দাম ক্রেতাদের নাগালের মধ্যে নামিয়ে আনতে সক্ষম হবেন। অন্যথায়, সাধারণ মানুষের প্রযুক্তিগত অন্তর্ভুক্তি বড় ধরনের বাধার মুখে পড়বে।




















