কুমিল্লায় রবি আজিয়াটা পিএলসির একটি কার্যালয়ে আর্থিক অনিয়ম ও নন-কমপ্লায়েন্সের অভিযোগ তোলার পর প্রতিশোধমূলক আচরণের শিকার হওয়ার অভিযোগ করেছেন প্রতিষ্ঠানটির এক ভেন্ডর কর্মী।
কুমিল্লার বাসিন্দা শারমিন আক্তার দাবি করেছেন, রবি আজিয়াটার ব্রাঞ্চ ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্ব পালন করা এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অফিসের নগদ অর্থ, স্ক্র্যাচ কার্ড, পেটি ক্যাশসহ বিভিন্ন আর্থিক বিষয়ে অনিয়মের অভিযোগ প্রমাণসহ তিনি একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন।
তার ভাষ্য, অভিযোগের পর ওই কর্মকর্তাকে বরিশালে বদলি করা হলেও তাঁর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের তদন্ত বা চূড়ান্ত ব্যবস্থা সম্পর্কে তিনি কোনো পরিষ্কার তথ্য পাননি। বরং পরে তাঁকেই অন্যত্র বদলি এবং পদত্যাগে চাপ দেওয়া হয়েছে।
শারমিন বলেন, “আমি শুধু একটি নিরপেক্ষ, স্বচ্ছ ও সময়মতো তদন্ত, সকল কর্মীর জন্য সমান নীতি প্রয়োগ এবং ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত প্রত্যাশা করছি।”
অভিযোগের শুরু যেভাবে
শারমিনের দাবি, তিনি Searchlite Communications Limited-এর কর্মী হিসেবে ১০ বছরের বেশি সময় ধরে কুমিল্লার রবি কার্যালয়ে ভেন্ডরের অধীনে কাজ করেছেন। এ সময় কার্যালয়ের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কাজে যুক্ত থাকার কারণে সংশ্লিষ্ট ম্যানেজারের আর্থিক লেনদেন ও অফিস ব্যবস্থাপনার কিছু বিষয় তাঁর নজরে আসে।
তার অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অফিসের দৈনিক নগদ অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার, ব্যাংকে অর্থ জমা দিতে বিলম্ব, বিকাশ এজেন্টের অর্থ ব্যবহারের অভিযোগ, স্ক্র্যাচ কার্ড বিক্রির অর্থ নির্ধারিত সময়ে সিস্টেমে না দেখানো, পেটি ক্যাশের অর্থের বিপরীতে কথিত ভুয়া ভাউচার তৈরি এবং বিভিন্ন খাতে বরাদ্দ অর্থ ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগ।
শারমিনের দাবি, এসব বিষয়ে তাঁর কাছে ডিপোজিট বই, লেনদেনের তথ্য, ই-মেইল এবং বিভিন্ন প্রতিবেদনের মতো নথি রয়েছে।
তিনি আরও দাবি করেন, ২০২২ সালে অডিটের সময় ওই ম্যানেজার তাঁর কাছ থেকে ৪০ হাজার টাকা ধার নিয়েছিলেন। দীর্ঘ সময় পর ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে তিনি সেই টাকা ফেরত পান। এরপর থেকেই তাঁর সঙ্গে ম্যানেজারের আচরণ বদলে যায় বলে অভিযোগ করেন তিনি।
‘অভিযোগ করায় কেন লড়াই করতে যাচ্ছেন’
শারমিন জানান, ২০২৫ সালের আগস্টে তিনি প্রথমে ভেন্ডর কর্তৃপক্ষ এবং ম্যানেজারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে লিখিতভাবে বিষয়টি জানান। পরে ১ অক্টোবর আজিয়াটা গ্রুপের ‘Speak Up’ চ্যানেলেও অভিযোগ করেন।
তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ভেন্ডর কর্তৃপক্ষের একজন কর্মকর্তা অভিযোগের বিষয়ে তাঁকে বলেন, “তুমি তোমার বসের বিরুদ্ধে অভিযোগ কেন করেছ?”, “তুমি এত বড় একটা কোম্পানির সঙ্গে কেন লড়তে যাচ্ছ?” এবং “তুমি কি কুমিরের সঙ্গে পারবে?”
শারমিনের দাবি, তাঁকে এমনকি পদত্যাগের পরামর্শও দেওয়া হয়েছিল এবং তাঁকে ও অন্য সিনিয়র এজেন্টদের বদলি করা হতে পারে বলে জানানো হয়েছিল।
অভিযোগের পর ম্যানেজারের বদলি
অভিযোগ করার কয়েকদিন পর, ৯ অক্টোবর ২০২৫ নাগাদ অন্যের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন সংশ্লিষ্ট ব্রাঞ্চ ম্যানেজারকে বরিশালে বদলি করা হয়েছে।
তবে অভিযোগ তদন্তের ফলাফল বা ওই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তাঁকে কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি বলে দাবি শারমিনের।
তিনি বলেন, একজন ভেন্ডর কর্মী হিসেবে ছোটখাটো অনিয়মের অভিযোগেও এজেন্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার অভিজ্ঞতা তাঁর রয়েছে। অথচ একজন স্থায়ী কর্মীর বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠার পরও কেন একই ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, সেটিই তাঁর প্রশ্ন।
নয় মাস পর বদলির নির্দেশ
শারমিনের অভিযোগ, অভিযোগের প্রায় নয় মাস পর ৭ জুলাই ২০২৬ ভেন্ডরের মানবসম্পদ বিভাগের দুই কর্মকর্তা কুমিল্লার রবি কার্যালয়ে গিয়ে তাঁকে চট্টগ্রামের মোহরা রবি অফিসে বদলির কাগজে স্বাক্ষর করতে বলেন।
তিনি এতে রাজি না হওয়ায় তাঁকে সাদা কাগজে পদত্যাগপত্র দেওয়ার জন্যও চাপ দেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁর।
শারমিন বলেন, তিনি তাঁর বয়স্ক মাকে নিয়ে একা থাকেন। ফলে চট্টগ্রামে বদলি তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় জানিয়ে বদলির কারণ লিখিতভাবে জানাতে বলেন। তবে প্রথমে তাঁকে কোনো ই-মেইল বা লিখিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন তিনি।
পরে ৭ জুলাই তাঁকে ই-মেইল পাঠানো হলে ১১ জুলাই লিখিতভাবে নিজের অবস্থান জানান শারমিন। ডাকযোগেও তিনি বিষয়টি জানান বলে দাবি করেন।
‘অফিসের আইডি বন্ধ করে দেওয়া হয়’
শারমিনের দাবি, ৭ জুলাই মানবসম্পদ বিভাগের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাঁর মোবাইলে অফিসের বিভিন্ন আইডি বন্ধ হয়ে যাওয়ার নোটিফিকেশন আসে।
এরপর তিনি ব্যক্তিগত ই-মেইল থেকে রবি আজিয়াটার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানান। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সিইও তাঁকে জানান যে বিষয়টি তিনি এইচআরের কাছে পাঠিয়ে দিয়েছেন।
শারমিনের দাবি, ওইদিন সন্ধ্যায় ভেন্ডর কর্তৃপক্ষ তাঁকে জানায়, বদলি আপাতত স্থগিত করা হয়েছে এবং পরদিন থেকে আগের কর্মস্থলে কাজ করতে বলা হয়।
কিন্তু পরদিন অফিসে গিয়ে অফিসিয়াল আইডি না থাকায় কাজ করতে সমস্যায় পড়েন তিনি। পরদিন আবার তাঁকে বদলির কর্মস্থলে যাওয়ার কথা বলা হয় বলে দাবি তাঁর।
আবার ‘Speak Up’ চ্যানেলে অভিযোগ
এরপর শারমিন আবার আজিয়াটা গ্রুপের ‘Speak Up’ চ্যানেলে অভিযোগ করেন।
সেখানে তিনি অভিযোগ করেন, অনিয়মের বিষয়ে অভিযোগ করার কারণে তাঁকে ‘retaliation’-এর শিকার হতে হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযোগের পরও সংশ্লিষ্ট ম্যানেজারের বিরুদ্ধে কেন চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, তা জানতে চান তিনি।
শারমিনের ভাষায়, “অফিসের জিরো টলারেন্স নীতি শুধু ভেন্ডরের কর্মীদের জন্য কেন হবে? রবি’র স্থায়ী কর্মীদের জন্য কেন হবে না?”
শারমিন জানান, তাঁর সর্বশেষ অভিযোগের তদন্ত এখনও শেষ হয়নি এবং ‘Speak Up’ চ্যানেল থেকে তাঁকে এমনটাই জানানো হয়েছে। এখন পর্যন্ত কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও তিনি পাননি।


















