একটি আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে কোটি কোটি মোবাইল ফোন দেশের নেটওয়ার্কে সচল থাকার তথ্য সামনে আসার পরও মোবাইল হ্যান্ডসেটের বৈধতা যাচাইয়ের ব্যবস্থা ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) বাস্তবায়ন করতে পারেনি বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। অথচ অবৈধভাবে আমদানি করা ফোনের প্রবেশ বন্ধ এবং নকল বা ক্লোন আইএমইআইযুক্ত হ্যান্ডসেট শনাক্ত করার লক্ষ্যেই এ ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
বিশ্বজুড়ে মোবাইল নেটওয়ার্কে হ্যান্ডসেট শনাক্ত করার জন্য আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর ব্যবহৃত হয়। সাধারণত প্রতিটি মোবাইল হ্যান্ডসেটের জন্য একটি স্বতন্ত্র আইএমইআই থাকে। দুই সিমের ফোনে সাধারণত দুটি আইএমইআই নম্বর থাকে। এই নম্বরের মাধ্যমে হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা যায় এবং প্রয়োজনে সেটিকে নেটওয়ার্কে ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়।
কিন্তু একই আইএমইআই নম্বর একাধিক হ্যান্ডসেটে ব্যবহার করা হলে তা ক্লোন আইএমইআইয়ের সমস্যা তৈরি করে। এতে হ্যান্ডসেটের প্রকৃত পরিচয় শনাক্ত করা এবং অবৈধ ফোনের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
একটি নম্বরে ৩ কোটি ৯১ লাখ ফোন
সরকারের গত ৩ জানুয়ারির এক তথ্য বিবরণীতে গত ১০ বছরের হিসাব তুলে ধরে বলা হয়, 99999999999999 আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে মোট ৩ কোটি ৯১ লাখ ২২ হাজার ৫৩৪টি হ্যান্ডসেট পাওয়া গেছে।
তথ্য বিবরণীতে আরও বলা হয়, দেশে কোটি কোটি নকল আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করে মোবাইল হ্যান্ডসেট চালু রয়েছে। তবে এসব ফোন তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করা হবে না বলেও সে সময় জানানো হয়েছিল।
একটি আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে এত বিপুলসংখ্যক হ্যান্ডসেটের উপস্থিতি দেশের মোবাইল বাজারে ডিভাইস শনাক্তকরণ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অবৈধ ফোনের জন্য সময়সীমা, বাস্তবায়ন হয়নি ব্যবস্থা
গ্রে মার্কেটের ব্যবসায়ীদের অবৈধভাবে আমদানি করা ফোনের বিষয়ে নিয়মিত ব্যবস্থার আওতায় আসার সুযোগ দিতে সরকার ১৫ মার্চ পর্যন্ত সময় রেখেছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর নেটওয়ার্কে নতুন করে অবৈধ ফোন যুক্ত হতে না দেওয়ার কথা ছিল।
পরিকল্পনায় প্রতিটি হ্যান্ডসেটকে নেটওয়ার্কে নিবন্ধনের আওতায় আনার বিষয়টি ছিল। পাশাপাশি সিমকার্ড পরিবর্তন, হ্যান্ডসেট বিক্রি কিংবা মালিকানা বদলের ক্ষেত্রে নিবন্ধন বাতিল বা ‘ডিরেজিস্ট্রেশন’ প্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা হয়।
তবে নির্ধারিত সময়সীমার পরও এনইআইআর ব্যবস্থা কার্যকর করা যায়নি। ফলে অবৈধভাবে আমদানি করা ফোন ও ক্লোন আইএমইআইযুক্ত হ্যান্ডসেট নিয়ন্ত্রণে উদ্যোগটির বাস্তব প্রয়োগ নিয়ে প্রশ্ন রয়ে গেছে।
অনুমোদনের অপেক্ষায় বিটিআরসি
বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “যেদিন আমরা একটি আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে ৯৯ লাখ ফোনের অস্তিত্ব পেলাম সেদিন এনইআইআর বাস্তবায়নের তাগিদ অনুভব করলাম।”
তিনি বলেন, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে বিটিআরসিকে আগামী ১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর বাস্তবায়নের তাগিদ দেওয়া হচ্ছে। বিষয়টি জানিয়ে বাস্তবায়নের অনুমোদন চেয়ে গত সপ্তাহে ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে কমিশন।
বিটিআরসি চেয়ারম্যানের ভাষ্য, “উই আর রেডি। যেদিন সরকার অনুমোদন দেবে সেদিনই আমরা কার্যক্রম শুরু করে দেব।”
অর্থাৎ, কমিশনের দাবি অনুযায়ী, এনইআইআর চালুর প্রস্তুতি থাকলেও কার্যক্রম শুরুর জন্য সরকারের অনুমোদন প্রয়োজন। তবে অনুমোদন কবে আসবে এবং ব্যবস্থা কার্যকর হলে বিদ্যমান ক্লোন আইএমইআইযুক্ত ফোনগুলোর বিষয়ে কী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বাস্তবায়ন না হলে প্রশ্ন থেকেই যাবে
এনইআইআর চালু হলে বৈধ ও অবৈধ হ্যান্ডসেট শনাক্ত করা, ক্লোন আইএমইআইয়ের ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ এবং নতুন অবৈধ ফোন নেটওয়ার্কে যুক্ত হওয়া ঠেকানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এর কার্যকারিতা নির্ভর করবে নির্ভুল ডেটাবেইস, স্বচ্ছ নিবন্ধনপ্রক্রিয়া, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং গ্রাহকবান্ধব ব্যবস্থাপনার ওপর।
বিশেষ করে আগে থেকেই নেটওয়ার্কে সচল থাকা কোটি কোটি হ্যান্ডসেটের ক্ষেত্রে কীভাবে যাচাই হবে, বৈধ মালিকেরা কীভাবে নিজেদের ফোন নিবন্ধন করবেন এবং ভুল শনাক্তকরণের কারণে কোনো গ্রাহকের সংযোগ বন্ধ হলে প্রতিকার কী হবে—এসব বিষয়ে পরিষ্কার নির্দেশনা প্রয়োজন।
এনইআইআর বাস্তবায়নের সময়সীমা একাধিকবার আলোচনায় এলেও কার্যকর ব্যবস্থা চালু না হওয়ায় এখন মূল প্রশ্ন, অনুমোদন পাওয়ার পর বিটিআরসি কত দ্রুত এবং কতটা স্বচ্ছভাবে এই ব্যবস্থা কার্যকর করতে পারে।





















