জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) তথ্যভান্ডারে প্রবেশাধিকার সীমিত করে দেওয়ায় দেশের ব্যাংকগুলোতে অনলাইনে তাৎক্ষণিক গ্রাহক হিসাব খোলার প্রক্রিয়া প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর ফলে, প্রবাসীদের বিদেশ থেকে ব্যাংকিং সেবা গ্রহণ এবং দেশের অভ্যন্তরে ডিজিটাল পদ্ধতিতে হিসাব খোলার সুযোগ মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। এমনকি সনাতন পদ্ধতিতেও হিসাব খুলতে ব্যাংকগুলো সমস্যার সম্মুখীন হচ্ছে।
মূল সংকট
মূলত নির্বাচন কমিশন (ইসি) কর্তৃক এনআইডি তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তা জোরদার করার পদক্ষেপের ফলে এই সংকটের সৃষ্টি হয়েছে। পূর্বে ব্যাংকগুলো সরাসরি সার্ভার থেকে গ্রাহকের ছবি, ঠিকানা, আঙুলের ছাপসহ সকল তথ্য যাচাই করতে পারত। কিন্তু সম্প্রতি তথ্য ফাঁসের ঘটনার পর ইসি এই সরাসরি প্রবেশাধিকার বন্ধ করে দিয়েছে।
এর পরিবর্তে, অ্যাপ্লিকেশন প্রোগ্রামিং ইন্টারফেস (এপিআই) ব্যবস্থা চালু করা হয়েছে, যার মাধ্যমে এখন শুধুমাত্র গ্রাহকের নাম, জন্মতারিখ ও এনআইডি নম্বর যাচাই করা সম্ভব। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (বিএফআইইউ)-এর নিয়ম অনুযায়ী, শুধু এই তিনটি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে হিসাব খোলা সম্ভব নয়।
প্রধান সমস্যাগুলো:
১. সীমিত তথ্য যাচাই: নতুন এপিআই ব্যবস্থায় গ্রাহকের ঠিকানা, পিতা-মাতার নাম বা আঙুলের ছাপের মতো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য যাচাইয়ের কোনো সুযোগ নেই। ২. ভাষাগত জটিলতা: এপিআই থেকে প্রাপ্ত তথ্য মূলত বাংলা ভাষায় থাকে, যা ব্যাংকগুলোর ইংরেজি-ভিত্তিক কোর ব্যাংকিং সফটওয়্যারের সাথে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মেলানো প্রায় অসম্ভব। ৩. ম্যাচ/নন-ম্যাচ পদ্ধতি: আগে তথ্যের অমিল ৮০ শতাংশ পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য হলেও, নতুন নিয়মে তথ্যের শতভাগ মিল না হলে তা ‘নন-ম্যাচ’ বা অমিল হিসেবে দেখানো হচ্ছে। ৪. স্থায়ী ঠিকানা যাচাই বন্ধ: নতুন পদ্ধতিতে গ্রাহকের স্থায়ী ঠিকানা জানার সুযোগ নেই, যা কেওয়াইসি (KYC) পূরণের জন্য অপরিহার্য।
প্রভাব
এই পরিবর্তনের ফলে ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন, ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের নেক্সাস পে, সিটি ব্যাংকের এখনই অ্যাকাউন্টসহ বিভিন্ন ব্যাংকের জনপ্রিয় তাৎক্ষণিক ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবাগুলো বন্ধ হয়ে গেছে। এটি দেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি কার্যক্রম এবং ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ব্যাংকগুলোর অবস্থান ও দাবি
ব্যাংকগুলোর প্রধান নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশ (এবিবি) এই সমস্যা সমাধানে নির্বাচন কমিশনের কাছে একটি চিঠি দিয়েছে। তাদের প্রধান দাবিগুলো হলো:
- ইংরেজিতে গ্রাহকের নাম, পরিচয়পত্র নম্বর ও জন্মতারিখ মিললেই যেন তার সম্পূর্ণ তথ্য (ছবিসহ) সরবরাহ করা হয়।
- আঙুলের ছাপ মেলানোর সুবিধা পুনরায় চালু করা, যা নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অত্যন্ত জরুরি।
- অন্তত ৩০ জুলাই পর্যন্ত পুরনো সার্ভারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ দেওয়া, যাতে এই সময়ের মধ্যে একটি কার্যকর সমাধান খুঁজে বের করা যায়।
সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসরুর আরেফিনের মতে, এই পরিস্থিতি দেশের ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার বিকাশের পথে এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় বাধা। নির্বাচন কমিশন, বিএফআইইউ এবং ব্যাংকগুলোর মধ্যে একাধিক বৈঠক হলেও এখন পর্যন্ত কোনো স্থায়ী সমাধান আসেনি।






















