শেয়ারবাজারে তালিকাভুক্ত আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংকের выс পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে একটি সংঘবদ্ধ চক্র অভিনব উপায়ে ১০৯ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানের বড় অংকের আমানতকে তৃণমূল পর্যায়ের এজেন্টদের সংগ্রহ হিসেবে দেখিয়ে তার বিপরীতে কমিশন বাবদ এই বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে।
২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে পরিচালিত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই তদন্তে ব্যাংকটির এজেন্ট ব্যাংকিং বিভাগ, ট্রেজারি বিভাগ, আর্থিক প্রশাসন বিভাগ (FAD) এবং ঊর্ধ্বতন নির্বাহীদের জড়িত থাকার প্রমাণ মিলেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, একটি সুসংগঠিত সিন্ডিকেট এবং ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার সুযোগে এই জালিয়াতি প্রায় এক দশক ধরে চলমান ছিল, যার ফলে ব্যাংকের তহবিল অপব্যবহার, আর্থিক ক্ষতি এবং সরকারের বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ফাঁকি দেওয়া হয়েছে।
যেভাবে ঘটানো হয়েছে জালিয়াতি
আল-আরাফাহ ইসলামী ব্যাংক ২০১৫ সালে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জন্য এজেন্ট ব্যাংকিং সেবা চালু করে। নিয়ম অনুযায়ী, এই সেবার মাধ্যমে ক্ষুদ্র অংকের আমানত সংগ্রহ করা হয় এবং তার বিপরীতে এজেন্টদের নির্দিষ্ট হারে কমিশন দেওয়া হয়। কিন্তু ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই ব্যবস্থাকে অপব্যবহার করেন।
তদন্তে দেখা যায়, ব্যাংকের কর্মকর্তারা নিজেরাই বড় বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চ সুদে আমানত সংগ্রহ করতেন। এরপর সেই আমানতকে তৃণমূলের বিভিন্ন এজেন্টের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে कागজপত্রে দেখাতেন। এর ফলে ওই বড় অংকের আমানতের ওপরও এজেন্ট কমিশন ধার্য করা হয়, যা সরাসরি কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন এজেন্ট আউটলেটের অ্যাকাউন্টে চলে যেত।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতে, এজেন্ট ব্যাংকিং মূলত নিম্ন আয়ের গ্রাহকদের জন্য, যেখানে লেনদেনের পরিমাণ ১০-১৫ লাখ টাকায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু আল-আরাফাহ ব্যাংক ১২-১৩ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ সুদ এবং তার ওপর অতিরিক্ত কমিশনের লোভ দেখিয়ে কর্পোরেট আমানতকে এই পথে পরিচালিত করেছে।
রাষ্ট্রের ৩৬ কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি
এই জালিয়াতির মাধ্যমে ব্যাংকটি কেবল গ্রাহকের অর্থই নয়, রাষ্ট্রীয় কোষাগারেরও বিপুল ক্ষতি করেছে। এজেন্টদের দেওয়া কমিশনের ওপর ১০ শতাংশ উৎসে কর কেটে রাখার নিয়ম থাকলেও ব্যাংক তা পালন করেনি। এর ফলে ২০১৫ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত সরকার ৩৬ কোটি ১১ লাখ টাকার রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।
কেঁচো খুঁড়তে বেরিয়ে এলো সাপ
তদন্তে নির্দিষ্ট কয়েকজন কর্মকর্তার নাম ও তাদের জালিয়াতির চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে:
আসাদুর রহমান (সাবেক এভিপি): তিনি একাই সিভিল এভিয়েশন ওয়েলফেয়ার ফান্ড থেকে ২৩ কোটি টাকার আমানত সংগ্রহ করে তা আটিপাড়া এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমে দেখানো হয়। ওই ফান্ডের অ্যাকাউন্টে তার ব্যক্তিগত ফোন নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল। পরবর্তীতে প্রমাণ লোপাটের জন্য সেই নম্বর মুছে ফেলা হয়। তার পরিবারের সদস্যদের নামে থাকা একাধিক এজেন্ট আউটলেটের মাধ্যমেও বিপুল পরিমাণ কর্পোরেট আমানত পরিচালিত হতো।
শহিদুল হোসেন (সিনিয়র প্রিন্সিপাল অফিসার): তিনি মোল্লা এন্টারপ্রাইজ নামক একটি এজেন্ট আউটলেটের সুবিধাভোগী মালিক ছিলেন, যা কর্পোরেট আমানত আত্মসাতের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তদন্তে দেখা যায়, ২০২৩ সালের জুনে এই আউটলেটের অ্যাকাউন্ট থেকে ২১ লাখ টাকা শহিদুলের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়।
আবেদ আহমেদ খান (সাবেক ডিএমডি): এজেন্ট ব্যাংকিং বিভাগের দীর্ঘদিনের প্রধান ছিলেন তিনি। তদন্তে দেখা যায়, আজহার ট্রেডার্স নামক একটি এজেন্ট অ্যাকাউন্ট থেকে ৫০ লাখ টাকা তার স্ত্রীর নামে থাকা মুনতাহা এন্টারপ্রাইজের অ্যাকাউন্টে স্থানান্তর করা হয়। পরিদর্শকরা এই সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, এই লেনদেনের মূল সুবিধাভোগী ছিলেন আবেদ আহমেদ নিজেই।
মোহাম্মদ নাদিম (সিএফও) এবং ফরমান আর চৌধুরী (এমডি): আর্থিক প্রশাসন বিভাগের প্রধান নাদিম ক্ষমতার অপব্যবহার করে নিয়মিতভাবে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ সুদের অনুমোদন দিয়েছেন। অন্যদিকে, ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরমান চৌধুরী এবং নাদিম উভয়েই জেনারেল লেজার (GL) অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে আয় গোপন এবং কর ফাঁকি দিয়েছেন। তারা দুজন ব্যাংকের নিয়ম লঙ্ঘন করে যথাক্রমে ৫১.৯ লাখ এবং ১.৯ লাখ টাকা অতিরিক্ত প্রণোদনা বোনাস হিসেবে গ্রহণ করেছেন।
ব্যাংকের পদক্ষেপ ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণ
এই অনিয়ম প্রকাশ্যে আসার পর গত এপ্রিলে আল-আরাফাহ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরমান চৌধুরী, সিএফও নাদিমসহ আট কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠিয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ব্যাংকের মূল বিভাগগুলোর কর্মকর্তারা ৫ থেকে ২০ বছর ধরে একই পদে নিযুক্ত ছিলেন, যা এই ধরনের সিন্ডিকেট তৈরি এবং অপব্যবহার টিকিয়ে রাখতে সহায়তা করেছে। এই ঘটনাটি ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম দুর্বলতাকেই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে।





















