এস আলম গ্রুপের নিয়ন্ত্রণে থাকার সময়ে ইসলামী ব্যাংকে কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজার ৫৪২ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের বিশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদনে উঠে এসেছে। ২০১৭ থেকে ২০২৪ সালের আগস্ট পর্যন্ত ব্যাংকটিতে মোট ১০ হাজার ৮৩২ জন নিয়োগ পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ পাওয়া ৮ হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে চট্টগ্রাম জেলার ৮ হাজার ৯৯ জন। এর মধ্যে শুধু পটিয়া উপজেলার বাসিন্দা ছিলেন ৫ হাজার ১৪৮ জন। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যানের পটিয়ার বাড়ি ও চট্টগ্রামের আসাদগঞ্জের অফিসে বিভিন্ন পদের নামে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার বাক্স রাখা হয়েছিল।
ইসলামী ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতিমালা অনুযায়ী, নিয়োগের ক্ষেত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পর যোগ্য প্রার্থীদের লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষা নেওয়ার বিধান ছিল। তবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২৭টি পদে বিজ্ঞপ্তি ও পরীক্ষা ছাড়াই নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার (ক্যাশ) ২ হাজার ৭৮৯ জন, ট্রেইনি অ্যাসিস্ট্যান্ট অফিসার ২ হাজার ১৬০ জন, মেসেঞ্জার কাম গার্ড ১ হাজার ৫৪৪ জন এবং আরডিএস প্রকল্পে ৯১৫ জন রয়েছেন।
উচ্চপর্যায়ের নিয়োগেও অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুইজন এমডি, আটজন ডিএমডি, দুইজন এসইভিপি এবং চারজন ইভিপিকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয়। ডিএমডি হওয়ার ক্ষেত্রে নির্ধারিত অভিজ্ঞতার শর্তও কিছু নিয়োগে পূরণ করা হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ছাঁটাই নিয়েও তদন্ত
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর নিয়োগ নিয়ে বিভিন্ন পরিদর্শন ও নিরীক্ষায় অনিয়মের তথ্য পাওয়ার পর নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা যাচাইয়ের সিদ্ধান্ত নেয় ইসলামী ব্যাংকের পর্ষদ। ২০২৫ সালে মূল্যায়ন পরীক্ষা আয়োজন করা হয়। এতে অংশ নেওয়া ৪০২ জনের সবাই চাকরিতে বহাল থাকলেও ৪ হাজার ৯৭১ জন পরীক্ষায় অংশ নেননি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, পরবর্তী সময়ে ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ ৪ হাজার ৬৮৫ জনকে চাকরি থেকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেয়। ইসলামী ব্যাংকের ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আলতাফ হুসাইন দাবি করেন, যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই এসব কর্মীকে ছাঁটাই করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, কর্মী নিয়োগ ও ছাঁটাই ব্যাংকের নিজস্ব বিষয় এবং ইসলামী ব্যাংক কর্তৃপক্ষই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করা সমীচীন হবে না।
কোন জেলা থেকে কত নিয়োগ?
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরীক্ষা ছাড়া নিয়োগ পাওয়া ৮ হাজার ৫৪২ জনের মধ্যে চট্টগ্রামের পর কক্সবাজারের ৩৯৮, কুমিল্লার ১১৪, ময়মনসিংহের ৯৯, বগুড়ার ৯৭ এবং ঢাকার ৯৬ জন ছিলেন। অন্য বিভিন্ন জেলা থেকেও কর্মী নিয়োগ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শক দল দৈবচয়নের ভিত্তিতে ১০ জন কর্মকর্তার বক্তব্যও নিয়েছে। তাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, এস আলমের পটিয়ার বাড়ি ও আসাদগঞ্জের অফিসে রাখা বাক্সে জীবনবৃত্তান্ত জমা দেওয়ার পর সেখানেই মৌখিক পরীক্ষা ও নিয়োগসংক্রান্ত কার্যক্রম হয়েছে।
প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগেও প্রশ্ন
প্রতিবেদনে ইসলামী ব্যাংকের প্রবেশনারি অফিসার নিয়োগ নিয়েও অনিয়মের তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে। ২০১৯ সালের ২৪তম ব্যাচে ১৯০ জনকে বিজ্ঞপ্তি ছাড়া নিয়োগ দেওয়া হয় বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। তাদের মধ্যে ১২ জন লিখিত পরীক্ষায় অংশ না নিয়েও নিয়োগ পান। পরবর্তী সময়ে নিয়োগপ্রাপ্তদের বড় একটি অংশ চাকরি হারিয়েছেন।
তবে ২০১৭ সালের ১৪৪ জন এবং ২০২৪ সালের ২০০ প্রবেশনারি অফিসারের নিয়োগ যথাযথ প্রক্রিয়া মেনে হয়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।


















