জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি), ব্যাংক হিসাব, ভূমি, সঞ্চয়পত্র, যানবাহন ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) তথ্যভান্ডারের সঙ্গে যুক্ত করার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সম্ভাব্য করদাতা শনাক্ত এবং তাঁদের আয় ও সম্পদের একটি সমন্বিত পরিচিতি তৈরির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
গত রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এ বিষয়ে আলোচনা হয়। এ ব্যবস্থা চালু হলে আয়কর বিবরণীতে দেওয়া তথ্যের সঙ্গে একজন করদাতার ব্যাংক হিসাব, জমি-ফ্ল্যাট, যানবাহন, সঞ্চয়পত্র ও বিদেশ ভ্রমণের তথ্য মিলিয়ে দেখা সম্ভব হবে। ফলে আয় গোপন বা সম্পদের পরিমাণ কম দেখানোর প্রবণতা শনাক্ত করা সহজ হতে পারে।
বৈঠকে এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, চেয়ারম্যান এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদের বিবরণী দাখিল নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। একই সঙ্গে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের তথ্য নিয়মিত যাচাই এবং কর ব্যবস্থাপনায় সরাসরি যোগাযোগ কমিয়ে সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা চালুর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, বর্তমানে দেশের মোট সরকারি রাজস্বের প্রায় ৮৬ শতাংশ এই সংস্থার মাধ্যমে আদায় হয়।
৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্বের লক্ষ্য
এনবিআর জানিয়েছে, ২০২৫–২৬ অর্থবছরে সংস্থাটির রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা। এ পরিমাণ মোট বাজেট ব্যয়ের ৬৪ দশমিক ৪ শতাংশ এবং সরকারের মোট রাজস্বের ৮৬ দশমিক ৯ শতাংশ।
কমিটির সদস্যরা এ লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের মতে, বিদ্যমান করদাতাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দিয়ে নতুন করদাতা শনাক্ত এবং করের আওতা বাড়ানোর মাধ্যমে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে।
বর্তমানে দেশে প্রায় ১ কোটি ৩০ লাখ কর শনাক্তকরণ নম্বরধারী (টিআইএন) ব্যক্তি থাকলেও আয়কর বিবরণী দাখিল করেন প্রায় ৪৭ লাখ। ফলে টিআইএনধারী বিপুলসংখ্যক ব্যক্তিকে নিয়মিত কর ব্যবস্থার আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।
কর-জিডিপি অনুপাত বাড়ানোর লক্ষ্য
বর্তমানে বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। ২০২৬ সালে এটি ৮ দশমিক ৮ শতাংশ, মধ্য মেয়াদে ১০ শতাংশ এবং ২০৩৫ সালে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য রয়েছে।
বৈঠকে বলা হয়, এ লক্ষ্য অর্জনে শুধু করের হার বাড়ানো নয়; বরং নতুন করদাতা শনাক্ত, কর ফাঁকি রোধ, প্রকৃত আয় ও সম্পদের তথ্য সংগ্রহ এবং কর প্রশাসনের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
১০০ টাকা রাজস্বে ব্যয় ২১ পয়সা
বৈঠকে উপস্থাপিত তুলনামূলক হিসাবে বলা হয়, বাংলাদেশে ১০০ টাকা রাজস্ব আদায়ে প্রশাসনিক ব্যয় হয় ২১ পয়সা। একই পরিমাণ রাজস্ব আদায়ে জাপানে ব্যয় হয় ১ টাকা ৩ পয়সা, থাইল্যান্ডে ৭১ পয়সা এবং ভারতে ৬০ পয়সা।
কমবে করদাতা-কর্মকর্তার সরাসরি যোগাযোগ
কর ব্যবস্থায় দুর্নীতি ও হয়রানি কমাতে সরাসরি যোগাযোগ কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, মানুষের সরাসরি যোগাযোগ যত বেশি থাকবে, দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা তত কঠিন।
এনবিআর জানিয়েছে, অনলাইনে আয়কর বিবরণী দাখিল, উৎসে করের তথ্য ব্যবস্থাপনা, কর জমা, ভ্যাট বিবরণী দাখিল এবং অর্থ ফেরতের ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা হচ্ছে। আয়কর, ভ্যাট ও শুল্ক ব্যবস্থাকে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত স্বয়ংক্রিয় করার পরিকল্পনাও রয়েছে।
ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষায় জোর
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে করদাতাদের ২ শতাংশেরও কম ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার আওতায় আসেন। ২০২৩–২৪ অর্থবছর থেকে যন্ত্রনির্ভর পদ্ধতিতে ঝুঁকিভিত্তিক নিরীক্ষার জন্য করদাতা নির্বাচন করা হচ্ছে।
কমিটির মতে, এ ব্যবস্থা কার্যকর হলে নিয়মিত করদাতাদের অযথা হয়রানি কমবে এবং প্রকৃত আয় ও সম্পদের তুলনায় কম কর দেওয়া ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে শনাক্ত করা সহজ হবে।
ভ্যাট-শুল্কেও তথ্যের সমন্বয়
ভ্যাট ব্যবস্থায় শতভাগ অনলাইন বিবরণী দাখিল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের হিসাব ব্যবস্থার সঙ্গে ভ্যাট ব্যবস্থার সংযোগ, অনলাইনে চালান ও অর্থ ফেরত এবং তামাকজাত পণ্যের উৎপাদন ও সরবরাহের গতিপথ শনাক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ভবিষ্যতে শুল্ক, ভ্যাট ও আয়কর বিভাগের মধ্যে ইলেকট্রনিক ডাটা ইন্টারচেঞ্জ (ইডিআই) ব্যবস্থা গড়ে তোলার পরিকল্পনাও রয়েছে। আমদানি-রপ্তানি, ব্যাংক ও বন্দরের তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে কর ফাঁকি এবং পণ্যের মূল্য কম দেখানোর প্রবণতা শনাক্ত করার লক্ষ্য রয়েছে।
জনবল ঘাটতিও চ্যালেঞ্জ
এনবিআরের আধুনিকায়নের পাশাপাশি জনবল ঘাটতি দূর করার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। আয়কর বিভাগে অনুমোদিত পদ রয়েছে ১২ হাজার ৭৬৪টি। তবে এনবিআরের সামগ্রিক জনবলের মাত্র ৫৮ শতাংশ পদ পূরণ রয়েছে।
ফলে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও তথ্য অবকাঠামো নিশ্চিত করাও জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পদের হিসাব যাচাই
কমিটির সদস্য মো. সাইফুল আলম এনবিআরের কর-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারী, চেয়ারম্যান এবং তাঁদের পরিবারের সদস্যদের আয় ও সম্পদের হিসাবের বিষয়টি বিশেষভাবে উত্থাপন করেন। পরে এ বিষয়ে দৃশ্যমান ও জবাবদিহিমূলক উদ্যোগ নেওয়ার সুপারিশ করা হয়।
এনবিআরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০২৫ সালে সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যরা সম্পদের বিবরণী দাখিল করেছেন। ভবিষ্যতেও এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।
এ ছাড়া ভুয়া নিরীক্ষা প্রতিবেদন দাখিলের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। দায়িত্বে অবহেলা বা মিথ্যা প্রতিবেদন প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও পেশাজীবীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
সব মিলিয়ে, আয়-সম্পদের তথ্য সমন্বয়, এআইভিত্তিক করদাতা শনাক্তকরণ, স্বয়ংক্রিয় নিরীক্ষা, ডিজিটাল কর ব্যবস্থাপনা এবং করের আওতা সম্প্রসারণের মাধ্যমে রাজস্ব ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন আনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করবে প্রযুক্তি অবকাঠামো, তথ্যের নির্ভুলতা, ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষা এবং বাস্তবায়নে প্রশাসনিক সক্ষমতার ওপর।




















