ভারতে নিট পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া শিক্ষার্থী আন্দোলন এখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জে পরিণত হয়েছে। রাজধানী নয়াদিল্লিতে কয়েকদিন ধরে চলা বিক্ষোভ আরো বিস্তৃত হয়েছে, দাবি দাওয়াও বাড়িয়ে দিয়েছেন বিক্ষোভকারীরা।
আন্দোলনের কেন্দ্রস্থল যন্তর মন্তরে বুধবার সারাদিনই হাজারো শিক্ষার্থী ও তরুণের অবস্থান অব্যাহত ছিল। বৃষ্টি উপেক্ষা করে তারা জাতীয় পতাকা হাতে স্লোগান দিতে থাকেন। আন্দোলনকারীদের অনেকেই জানান, সোমবার ও মঙ্গলবার আটক হওয়ার পর থানা থেকে মুক্তি পেয়েই সরাসরি যন্তর মন্তরে ফিরে এসেছেন। তাদের ভাষ্য, দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত কেউ আন্দোলনের স্থান ছাড়বেন না। স্বেচ্ছাসেবীরা সেখানে খাবার, ওআরএস, ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসাসেবা দিচ্ছেন। আন্দোলনকারীদের সঙ্গে সংহতি জানাতে যন্তর মন্তরে অবস্থান করছেন সাধারণ মানুষও।
ভারতীয় গণমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্যানুযায়ী, শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ ও শিক্ষা ব্যবস্থা সংস্কারের পাশাপাশি এবার নতুন দাবি তুলেছেন ককরোচ জনতা পার্টির নেতারা। আগের দাবি আদায়ের সঙ্গে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের পরিবারকে এক কোটি রুপি ক্ষতিপূরণ ও আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহার চাইছেন তারা। যদিও সরকারের সঙ্গে আলোচনায় বসার আহ্বান জানিয়ে এদিন নিরপেক্ষ একটি স্থানে সিজেপি প্রতিনিধিদের সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং। তবে আন্দোলনকারীরা স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, আশ্বাস নয়, তারা দৃশ্যমান পদক্ষেপ চান।
এদিকে অনলাইনভিত্তিক ব্যঙ্গাত্মক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন দেশব্যাপী যুব আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার, প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ এবং কর্মসংস্থানের দাবিকে সামনে রেখে সংগঠনটি দ্রুত জনপ্রিয়তা পেয়েছে। দিল্লির পাশাপাশি মুম্বাই, বেঙ্গালুরু, কলকাতা, গোয়া, গৌহাটি, তিরুবনন্তপুরম, জম্মু ও আহমেদাবাদেও শিক্ষার্থী ও বিরোধী দলগুলোর উদ্যোগে বিক্ষোভ হয়েছে।
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি জানিয়ে এদিন দেশটির সংসদ ভবনের বাইরে বিক্ষোভ করেন বিরোধী সাংসদরা। কংগ্রেস নেতা ও লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে বিরোধী জোটের সাংসদরা কালো পোশাক পরে সংসদ ভবনের সামনে জড়ো হন। বিক্ষোভে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি দমন-পীড়নের প্রতিবাদ জানানো হয়। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ও শিক্ষামন্ত্রীর বিরুদ্ধেও স্লোগান দেন তারা।
পরে সংসদ অধিবেশনে বিরোধীরা দিল্লিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ওপর পুলিশি হামলা এবং প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা নিয়ে অবিলম্বে আলোচনার দাবি তোলেন। তবে আলোচনার আগে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকায় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। লোকসভায় সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব সরকারের কঠোর সমালোচনা করে বলেন, শিক্ষার্থীদের ওপর ‘নৃশংস হামলা’ চালানো হয়েছে এবং এর দায় সরকারকে নিতে হবে।
বিরোধীদের বিক্ষোভে সংসদের কার্যক্রম বারবার ব্যাহত হলে লোকসভা ও রাজ্যসভার অধিবেশন সাময়িকভাবে মুলতবি করা হয়। তবে সরকার জানিয়েছে, তারা নিট প্রশ্নপত্র ফাঁস ও শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনা করতে প্রস্তুত। সংসদীয় বিষয়ক মন্ত্রী কিরেন রিজিজু বলেন, ‘আমরা এখনই বিতর্কে বসতে প্রস্তুত। বিরোধীরাই শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের শর্ত দিয়ে আলোচনা বিলম্বিত করছে।’
রাজধানীর উত্তপ্ত পরিস্থিতিতে নিরাপত্তা জোরদারে (ডিএমআরসি) শহরের কেন্দ্রীয় অঞ্চলের ১৬টি মেট্রো স্টেশন পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত বন্ধ রাখার ঘোষণা দিয়েছে দিল্লি মেট্রো রেল করপোরেশন। এতে অফিসগামী ও সাধারণ যাত্রীদের চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয়। প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন, সংসদ ভবন ও যন্তর মন্তর ঘিরে অতিরিক্ত পুলিশ, আধাসামরিক বাহিনী এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
অন্যদিকে আন্দোলন নিয়ে প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান। সরকার নিট এবং শিক্ষা সংস্কার নিয়ে সংসদে বিস্তারিত আলোচনায় প্রস্তুত বলে জানিয়েছেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘ভারতের তরুণদের প্রতিটি যৌক্তিক উদ্বেগ নিয়ে আলোচনা করতে সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।’ তবে একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিরোধীরা রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করছে।




















