দৈনন্দিন জীবনে খাবার সংরক্ষণ থেকে শুরু করে পানি ও বিভিন্ন পানীয় ঠান্ডা রাখতে ফ্রিজের ওপর নির্ভর করতে হয় প্রায় প্রতিটি পরিবারকেই। তাই হঠাৎ ফ্রিজ বন্ধ হয়ে যাওয়া, পর্যাপ্ত ঠান্ডা না হওয়া কিংবা ভেতরে পানি জমে গেলে দ্রুত সমস্যার কারণ খুঁজে বের করা জরুরি।
তবে ফ্রিজের সব সমস্যার জন্য সঙ্গে সঙ্গে টেকনিশিয়ান ডাকতে হয় না। বিদ্যুৎ সংযোগ, থার্মোস্ট্যাট, দরজার রাবার সিল, ড্রেন পাইপ বা অতিরিক্ত বরফ জমার মতো কিছু সাধারণ সমস্যা ব্যবহারকারী নিজেই পরীক্ষা করে দেখতে পারেন।
ফ্রিজ ঠান্ডা না হলে
ফ্রিজ ঠান্ডা না হওয়ার পেছনে প্রথমেই বিদ্যুৎ সংযোগের বিষয়টি পরীক্ষা করা উচিত। পাওয়ার কর্ড সকেটে ঠিকভাবে লাগানো আছে কি না এবং কর্ডে কোনো দৃশ্যমান ক্ষতি রয়েছে কি না, তা দেখুন।
সার্কিট ব্রেকার বা ফিউজেও সমস্যা থাকতে পারে। একই সার্কিটে অতিরিক্ত বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার করা হলে এমন সমস্যা তৈরি হতে পারে। অন্য একটি বৈদ্যুতিক যন্ত্র ওই সকেটে সংযোগ দিয়ে সকেটটি সচল আছে কি না পরীক্ষা করা যায়।
বিদ্যুৎ সংযোগ ঠিক থাকলে ফ্রিজের থার্মোস্ট্যাটের সেটিং পরীক্ষা করুন। ভুল তাপমাত্রা নির্ধারণ করা থাকলে প্রয়োজন অনুযায়ী সেটি সমন্বয় করতে হবে।
ফ্রিজে অস্বাভাবিক শব্দ হলে
ফ্রিজ থেকে হালকা শব্দ হওয়া স্বাভাবিক। তবে হঠাৎ ঘর্ঘর, ঘষাঘষি বা অতিরিক্ত শব্দ শুরু হলে বিষয়টি পরীক্ষা করা দরকার।
কম্প্রেসরের চারপাশে কোনো বস্তু আটকে আছে কি না এবং ফ্রিজটি দেয়ালের সঙ্গে খুব বেশি লাগানো অবস্থায় রয়েছে কি না, তা দেখুন। পর্যাপ্ত বাতাস চলাচলের সুযোগ না থাকলেও কম্প্রেসর অতিরিক্ত গরম হতে পারে।
কনডেনসর বা ইভাপোরেটর ফ্যানেও ময়লা জমে শব্দ হতে পারে। আবার ফ্রিজারের ভেতরে অতিরিক্ত বরফ জমে ফ্যানের ব্লেড আটকে গেলেও অস্বাভাবিক শব্দ তৈরি হতে পারে। এমন হলে ফ্রিজ সম্পূর্ণভাবে ডিফ্রস্ট করে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তবে শব্দের সঙ্গে কম্প্রেসর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলে নিজে মেরামতের চেষ্টা না করে দক্ষ টেকনিশিয়ানের সহায়তা নেওয়া নিরাপদ।
ফ্রিজারে অতিরিক্ত বরফ জমলে
ফ্রিজের ভেতরে বা ফ্রিজারে অতিরিক্ত বরফ জমার অন্যতম কারণ দরজা ঠিকভাবে বন্ধ না হওয়া। দরজা দিয়ে বাইরের উষ্ণ বাতাস ঢুকে পড়লে ভেতরে বরফের স্তর তৈরি হতে পারে।
এ ক্ষেত্রে দরজার চারপাশে থাকা রাবারের গ্যাসকেট পরীক্ষা করুন। সেটি নোংরা, আলগা বা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ঠান্ডা বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে এবং বাইরের বাতাস ভেতরে ঢুকতে পারে।
গ্যাসকেট পরিষ্কার করে দেখুন। ক্ষতিগ্রস্ত হলে সেটি পরিবর্তনের প্রয়োজন হতে পারে।
ফ্রিজ থেকে পানি পড়লে
ফ্রিজের ভেতরে বা নিচে পানি জমে থাকলে ড্রেন লাইনে বাধা তৈরি হয়েছে কি না তা পরীক্ষা করা যায়।
ডিফ্রস্টের সময় গলে যাওয়া পানি সাধারণত নির্দিষ্ট ড্রেন পাইপ দিয়ে বের হয়ে যায়। খাবারের কণা, ময়লা বা বরফ জমে সেই পথ বন্ধ হয়ে গেলে পানি ফ্রিজের ভেতরে জমতে পারে।
ড্রেন পাইপের অবস্থান মডেলভেদে আলাদা হতে পারে। সাধারণত এটি ফ্রিজারের নিচের অংশ বা পেছনের প্যানেলের আশপাশে থাকে। সামান্য উষ্ণ পানি দিয়ে জমে থাকা বরফ বা ময়লা পরিষ্কার করা যেতে পারে।
এ ছাড়া ফ্রিজের নিচে থাকা ড্রেন প্যানেও পানি জমে থাকতে পারে। সেটি নিয়মিত পরীক্ষা ও পরিষ্কার করা প্রয়োজন। প্যানে ফাটল রয়েছে কি না, তাও দেখে নেওয়া উচিত।
ফ্রিজের আলো না জ্বললে
দরজা খোলার পর ভেতরের আলো না জ্বললে প্রথমে বাল্ব বা এলইডি লাইটের সমস্যা রয়েছে কি না দেখুন। পুরোনো ধরনের বাল্ব নষ্ট হয়ে গেলে সেটি পরিবর্তন করতে হবে।
আলো ঠিক থাকলেও না জ্বললে দরজার সুইচে সমস্যা থাকতে পারে। এই সুইচের মাধ্যমেই দরজা খোলা বা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে লাইটের কার্যক্রম নিয়ন্ত্রিত হয়।
ফ্রিজে দুর্গন্ধ হলে
ফ্রিজে দীর্ঘদিন রাখা পচা বা মেয়াদোত্তীর্ণ খাবার থেকে দুর্গন্ধ তৈরি হওয়া খুবই সাধারণ ঘটনা। তাই প্রথমে সব খাবার বের করে মেয়াদোত্তীর্ণ বা নষ্ট খাবার ফেলে দিন।
তাক, ড্রয়ার ও ফ্রিজের ভেতরের দেয়াল ভালোভাবে পরিষ্কার করুন। হালকা সাবান পানি বা বেকিং সোডা ব্যবহার করা যেতে পারে।
ড্রেন লাইন বা ড্রেন প্যানেও ময়লা জমে দুর্গন্ধ তৈরি হতে পারে। সেগুলো পরিষ্কার করার পাশাপাশি দুর্গন্ধ শোষণের জন্য ফ্রিজের ভেতরে একটি পাত্রে বেকিং সোডা বা অ্যাকটিভেটেড কার্বন রাখা যেতে পারে।
ফ্রিজ একেবারেই চালু না হলে
ফ্রিজ চালু না হলে প্রথমে পাওয়ার কর্ড ও ওয়াল সকেট পরীক্ষা করুন। অন্য কোনো বৈদ্যুতিক যন্ত্র দিয়ে সকেটটি সচল আছে কি না নিশ্চিত হওয়া যায়।
কম্প্রেসর অতিরিক্ত গরম হয়ে গেলেও ফ্রিজ সাময়িকভাবে বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে ফ্রিজটি বিদ্যুৎ সংযোগ থেকে বিচ্ছিন্ন করে কিছু সময় অপেক্ষা করা যেতে পারে। কম্প্রেসর ও এর ওভারলোড প্রোটেক্টর ঠান্ডা হলে কিছু মডেলে স্বাভাবিকভাবে চালু হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।
তবে দীর্ঘ সময় পরও ফ্রিজ চালু না হলে বা বারবার একই সমস্যা দেখা দিলে বৈদ্যুতিক অংশ, কম্প্রেসর কিংবা কন্ট্রোল সিস্টেমে ত্রুটি থাকতে পারে। সে ক্ষেত্রে নিজে খোলার পরিবর্তে প্রশিক্ষিত টেকনিশিয়ানের সহায়তা নেওয়াই নিরাপদ।
কখন টেকনিশিয়ানের সাহায্য নেবেন
বিদ্যুৎ সংযোগ, থার্মোস্ট্যাট, গ্যাসকেট বা ড্রেনের মতো সাধারণ বিষয় পরীক্ষা করেও সমস্যা ঠিক না হলে ফ্রিজের অভ্যন্তরীণ যন্ত্রাংশে ত্রুটি থাকতে পারে।
বিশেষ করে কম্প্রেসর অতিরিক্ত গরম হওয়া, পোড়া গন্ধ, বৈদ্যুতিক স্পার্ক, অস্বাভাবিক শব্দ কিংবা বারবার সার্কিট ব্রেকার ট্রিপ করার মতো ঘটনা ঘটলে ফ্রিজ বন্ধ রেখে পেশাদার টেকনিশিয়ানের সহায়তা নেওয়া উচিত।





















