ডিজিটাল যুগে আশীর্বাদ হয়ে আসা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এখন এক ভয়াবহ সংকটের মুখোমুখি। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক কিংবা হোয়াটসঅ্যাপের মতো জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলো আজ তথ্যের চেয়েও বেশি বিভ্রান্তি ও গুজব ছড়ানোর প্রধান উৎসে পরিণত হয়েছে। গত ২০ জানুয়ারি একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই অপতৎপরতা এখন চরম মাত্রায় পৌঁছেছে।
গুজব হলো এমন এক তথ্য যার কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস নেই এবং যা সত্য-মিথ্যা যাচাই ছাড়াই ছড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে, অপতথ্য হলো উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তৈরি করা মিথ্যা বা বিকৃত তথ্য, যা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করতে ব্যবহৃত হয়। বর্তমানে একটি ভুয়া ছবি বা এআই (AI) প্রযুক্তিতে তৈরি ‘ডিপফেক’ ভিডিও মুহূর্তের মধ্যেই জনমনে ক্ষোভ বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি করছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তদন্তে দেখা গেছে, আসন্ন সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী প্রার্থীদের টার্গেট করে ছড়ানো হচ্ছে বিভিন্ন স্ক্যান্ডাল ভিডিও ও অপতথ্য। পরিসংখ্যান বলছে, শুধুমাত্র গত ডিসেম্বর মাসেই রাজনীতি কেন্দ্রিক ৪৪৬টি ভুল তথ্য শনাক্ত করা হয়েছে। এর আগে ডিসেম্বর পর্যন্ত ৩০৯টি ভুল তথ্য ছড়ানোর রেকর্ড পাওয়া গেছে। প্রার্থীরা এতে যেমন সামাজিকভাবে হেয় হচ্ছেন, তেমনি সাধারণ ভোটাররাও সত্য-মিথ্যার পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন, যা গণতন্ত্রের মৌলিক ভিত্তিকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অনলাইনে এই ডিজিটাল অপশক্তি রুখতে সরকার ও প্রশাসন এখন হার্ডলাইনে। গৃহীত পদক্ষেপগুলোর মধ্যে রয়েছে:
মিসইনফরমেশন প্রতিরোধ সেল: নির্বাচন কমিশনের (ইসি) অধীনে একটি বিশেষ সেল গঠন করা হয়েছে।
যৌথ তদারকি: তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগ, জাতীয় সাইবার সুরক্ষা কাউন্সিল, বিটিআরসি এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী একযোগে কাজ করছে।
র্যাব ও সিআইডির মনিটরিং: র্যাবের ১৫টি ব্যাটালিয়ন সারা দেশে সাইবার মনিটরিং করছে। পাশাপাশি সিআইডির সাইবার সেন্টার থেকেও কড়া নজরদারি চালানো হচ্ছে।
সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের সাথে সমন্বয়: ফেসবুকসহ অন্যান্য প্ল্যাটফর্ম থেকে দ্রুত ক্ষতিকর কনটেন্ট অপসারণে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, শুধুমাত্র আইন দিয়ে গুজব পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন: ১. ডিজিটাল সাক্ষরতা: শিক্ষা ব্যবস্থায় তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা অন্তর্ভুক্ত করা। ২. দায়িত্বশীল শেয়ারিং: কোনো তথ্য শেয়ার করার আগে তার উৎস যাচাই করা এবং সন্দেহজনক তথ্য এড়িয়ে চলা। ৩. প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা: সামাজিক মাধ্যমগুলোকে আরও কার্যকরভাবে ভুয়া কনটেন্ট শনাক্ত ও অপসারণ করতে হবে।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রক্ষা করে ডিজিটাল অপরাধ দমন করা এখন সময়ের দাবি। তথ্যভিত্তিক সমাজ ও সুস্থ গণতন্ত্র নিশ্চিত করতে গুজব ও অপতথ্যের এই ডিজিটাল অপশক্তিকে প্রতিহত করা আমাদের সবার দায়িত্ব। তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত না করে কোনো কিছু প্রচার করা সমাজকে আরও বিভক্ত ও বিপর্যস্ত করে তুলতে পারে।



















