ফ্লাইট এক্সপার্ট, ফ্লাই ফার ইন্টারন্যাশনাল এবং সর্বশেষ ট্রাভেল বিজনেস পোর্টাল—তালিকাটি দীর্ঘ হচ্ছে। এটি আর বিচ্ছিন্ন কোনো দুর্ঘটনা নয়; এটি একটি ধারাবাহিক মহামারি। গ্রাহকদের শত শত কোটি টাকা নিয়ে অনলাইন ট্রাভেল এজেন্সি (ওটিএ) বা ভ্রমণ সংস্থাগুলোর উধাও হয়ে যাওয়া এখন একটি নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। পুরো ভ্রমণ খাতের ওপর মানুষের বিশ্বাস আজ ধ্বংসের মুখে। সবার মনে এখন একটাই প্রশ্ন—”পরবর্তী পালাবে কে?”
এই প্রশ্নের উত্তরটি কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির নামের মধ্যে নেই, উত্তরটি লুকিয়ে আছে তাদের ব্যবসায়িক মডেলের ভেতরে। এবং সেই হিসেবে, পরবর্তী কে পালাবে, তা আমরা সবাই জানি।
পরবর্তী পালাবে সে-ই, যে আপনাকে ‘অবিশ্বাস্য’ ছাড় দিচ্ছে।
যে কেউ বাজারমূল্যের চেয়ে অনেক কম দামে কোনো পণ্য বা সেবা বিক্রি করছে, ধরে নিতে হবে সে-ই পরবর্তী পলায়নকারী। ফ্লাইট এক্সপার্ট বা ফ্লাই ফার কোনো জাদুবলে অন্যদের চেয়ে কমে টিকেট দেয়নি। তারা একটি সুনির্দিষ্ট প্রতারণামূলক মডেল অনুসরণ করেছে, যা একটি টাইম বোমার মতো।
মডেলটি হলো: গ্রাহকের কাছ থেকে অগ্রিম টাকা নেওয়া এবং সেই টাকা দিয়ে তাৎক্ষণিক টিকেট বা সেবা না কিনে অন্য খাতে খাটানো বা নিজেদের দেনা মেটানো। যখন নতুন গ্রাহকের চাপ বাড়ে, তখন সেই নতুন গ্রাহকের টাকা দিয়ে পুরোনো গ্রাহকের টিকেট কেনা হয়। এই ‘মানি রোলিং’ বা ‘পনজি স্কিম’ভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত টিকে থাকা যায়, কিন্তু এটি ধসে পড়তে বাধ্য। যখনই নতুন টাকা আসার প্রবাহ কমে যায়, অথবা যখন একসাথে অনেক গ্রাহক তাদের সেবা (যেমন-টিকেট) দাবি করে, তখনই এই চক্র ভেঙে পড়ে। আর মালিকপক্ষ, যারা এই আসন্ন পতন সম্পর্কে আগে থেকেই জানে, তারা শেষ মুহূর্তের সব টাকা গুটিয়ে নিয়ে সটকে পড়ে।
এই পতনের জন্য দায়ী কে?
১. প্রতারক উদ্যোক্তারা: যারা জেনেশুনেই এই ঝুঁকিপূর্ণ মডেল তৈরি করেছেন, তাদের মূল উদ্দেশ্যই ছিল বাজার থেকে দ্রুত টাকা তুলে নেওয়া।
২. দায়িত্বজ্ঞানহীন গ্রাহক (আমরা): আমরাই কি এই সংকটের জন্য আংশিক দায়ী নই? ‘সবচেয়ে কম দামে’ কেনার লোভ, ‘অবিশ্বাস্য অফার’ দেখামাত্র ঝাঁপিয়ে পড়ার মানসিকতা এবং কোনোপ্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই অগ্রিম টাকা পাঠিয়ে দেওয়ার প্রবণতাই এই প্রতারকদের প্রধান অস্ত্র। আমরাই লোভের বশবর্তী হয়ে আমাদের কষ্টার্জিত টাকা এমন একটি প্রতিষ্ঠানের হাতে তুলে দিচ্ছি, যার ব্যবসায়িক ভিত্তিই নেই। আমরা দুই হাজার টাকা বাঁচাতে গিয়ে দুই লাখ টাকার ঝুঁকি নিচ্ছি।
৩. নিয়ন্ত্রক সংস্থার উদাসীনতা: এটাই সবচেয়ে ভয়াবহ দিক। ই-কমার্স বা ওটিএ খাত থেকে হাজার হাজার কোটি টাকা উধাও হয়ে যাচ্ছে, অথচ এই ডিজিটাল প্রতারণার কোনো সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রক সংস্থা নেই। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, পর্যটন মন্ত্রণালয় বা ট্রাভেল এজেন্টদের সংগঠন আটাব (ATAB)—কেউই এই অনৈতিক ব্যবসায়িক মডেল বন্ধ করতে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। ‘এসক্রো’ সেবা (টাকা আটকে রাখা) চালুর কথা বলা হলেও তা সঠিকভাবে বাস্তবায়ন হয়নি। ফলে এই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো গ্রাহকের টাকা সুরক্ষার কোনো ব্যবস্থা ছাড়াই ব্যবসা করার লাইসেন্স পেয়ে যাচ্ছে।
তাহলে পরবর্তী কে?
পরবর্তী সেই কোম্পানিই পালাবে, যে এখনও আপনাকে অন্যদের চেয়ে ২০ হাজার টাকা কমে ইউরোপের টিকেট বা ৫০% ছাড়ে থাইল্যান্ডের প্যাকেজ অফার করছে। পরবর্তী সে-ই পালাবে, যার একমাত্র পুঁজি চটকদার বিজ্ঞাপন, কিন্তু যার কোনো দৃশ্যমান ব্যবসায়িক কাঠামো নেই।
যতদিন না আমরা গ্রাহকরা ‘অফারের’ লোভ সামলে ‘ভরসার’ খোঁজ করব এবং যতদিন না সরকার এই ওটিএ প্ল্যাটফর্মগুলোর জন্য কঠোর লাইসেন্সিং এবং গ্রাহকের টাকা সুরক্ষায় ‘এসক্রো’ ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করবে, ততদিন এই পতনের মিছিল চলতেই থাকবে।
তাই পরবর্তী কে পালাবে, তা খুঁজতে জ্যোতিষী হওয়ার প্রয়োজন নেই। আপনার ফেসবুক ফিডে আসা অবিশ্বাস্য অফারটির দিকে তাকান—আপনি হয়তো পরবর্তী পলায়নকারীর বিজ্ঞাপনটিই দেখছেন।
বর্তমান বাজারে যে প্রতিষ্ঠান সবচেয়ে বেশি এবং সবচেয়ে দৃশ্যমান অফার দিচ্ছে তাদের মধ্যে আকাশবাড়ি হলিডেজ অন্যতম ।





















