ইরান তাদের এক পারমাণবিক স্থাপনার কাছে অবস্থিত ভূগর্ভস্থ একটি কমপ্লেক্সকে আগের তুলনায় মজবুত করছে বলে উপগ্রহের নতুন কিছু ছবি বিশ্লেষণে বোঝা যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ব্যাপক সামরিক উপস্থিতি ঘিরে উত্তেজনা এবং তেহরানের পরমাণু কর্মসূচি নিয়ে তাদের সঙ্গে ওয়াশিংটনের চলমান আলোচনার মধ্যেই ইরানের এ নতুন তৎপরতার বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেল, জানিয়েছে বিবিসি।
ইরান নতুন কোনো পারমাণবিক চুক্তিতে রাজি না হলে তাদের ওপর হামলার হুমকি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প আগেই দিয়ে রেখেছেন।
তার মধ্যেই উপগ্রহের সাম্প্রতিক ছবিতে ইরানকে তাদের কোলাং গাজ লা পাহাড়ে (অনেকের কাছে পিকঅ্যাক্স পাহাড় নামেও পরিচিত) টানেলের প্রবেশপথগুলো মজবুত করতে দেখা গেছে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংক ট্যাঙ্ক ইনস্টিটিউট ফর সায়েন্স অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল সিকিউরিটিই (আইএসআইএস) প্রথম উপগ্রহের ওই ছবিগুলো খতিয়ে দেখে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কর্মকাণ্ড বা সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ উপকরণের সুরক্ষায় ওই স্থাপনাটি মজবুত করা হতে পারে। তবে এটি আসলেই কী কাজে ব্যবহারের জন্য বানানো হয়েছে এবং এখনও এটি সচল আছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
ইরান তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ‘পুরোপুরি শান্তিপূর্ণ’ দাবি করে আসছে। তারা কোনো পারমাণবিক অস্ত্র বানাতে চাইছে না বলেও জোর দিয়ে বলছে।
যদিও গত বছরের জুনে ইসরায়েল-ইরান ১২ দিনের যুদ্ধ চলাকালে উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম উৎপাদনকারী ইরানের তিনটি ভূগর্ভস্থ স্থাপনায় হামলার নির্দেশ দেওয়ার সময় ট্রাম্প বলেছিলেন, তেহরান পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে ‘মাসখানেক দূরে দাঁড়িয়ে আছে’।
হামলায় ইরানের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ সক্ষমতা ‘নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে’ বলে পরে দাবিও করেন ট্রাম্প। সঙ্গে এও বলেন, “ইরানি কর্মকর্তারা নতুন একটি স্থাপনা চালুর কথা ভাবছে।”
গত বছর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের যে যে স্থানে বিমান হামলা চালিয়েছিল পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের স্থাপনাটি তার মধ্যে ছিল না। তবে এর দুই কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হয়েছিল।
১০ ফেব্রয়ারির এক উপগ্রহ চিত্রে পিকঅ্যাক্স পাহাড়ের স্থাপনার এক প্রবেশপথের ওপর নতুন কংক্রিট ঢালা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। ওই স্থানে কংক্রিট সরবরাহে ব্যবহৃত একটি বুম পাম্পও দেখা যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইএসআইএস ও যুক্তরাজ্যভিত্তিক গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষক প্রতিষ্ঠান মাইয়ারের বিশ্লেষকরা।
আরেকটি টানেলের প্রবেশপথের মাটি-পাথর সরিয়ে সমতল করা হয়েছে, কাছেই একটি নতুন কংক্রিটের স্থাপনা দেখা যাচ্ছে।
এসব পরিবর্তনের উদ্দেশ্যই হচ্ছে টানেলের প্রবেশপথগুলো মজবুত করা এবং কোনো বিমান হামলা হলে স্থাপনাকে অতিরিক্ত সুরক্ষা দেওয়া, ধারণা আইএসআইএস বিশেষজ্ঞদের।
ভারী নির্মাণ যন্ত্রপাতি ও উপকরণের উপস্থিতিতে মনে হচ্ছে স্থাপনাটি এখনও কার্যক্রম শুরুর জন্য প্রস্তুত নয়, বলছে আইএসআইএস।
“আগে ইরান এই নির্মাণকাজকে অত্যাধুনিক সেন্ট্রিফিউজ বানানোর কারখানা পুননির্মাণের অংশ হিসেবে হাজির করেছে, কিন্তু স্থাপনাটির আকার, বিশাল পাহাড় দ্বারা এর যে সুরক্ষা তাতে সেখানে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের মতো আরও সংবেদনশীল কিছুর পরিকল্পনা থাকতে পারে বলে সন্দেহ থেকেই যাচ্ছে,” বলেছে তারা।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে কাছাকাছি নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনা এবং ১২৫ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত ইস্ফাহান পারমাণবিক কেন্দ্রেও মেরামত ও সুরক্ষামূলক কার্যক্রম চলছে বলে উপগ্রহের ছবিতে দেখা যাচ্ছে।
ইস্ফাহানে স্থাপনার টানেল কমপ্লেক্সের সব প্রবেশপথই এখন মাটি দিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে বলে আইএসআইএসের উপগ্রহের ছবি বিশ্লেষণে উঠে এসেছে।
এভাবে মাটি দিয়ে প্রবেশপথ ঢেকে দেওয়ায় বিমান হামলার ক্ষয়ক্ষতি কমানো যেমন সম্ভব তেমনি ভেতরে যদি উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম থেকেও থাকে সেগুলো জব্দ বা ধ্বংসের চেষ্টায় স্থলপথে কোনো হামলা মোকাবেলায়ও বেশি সুরক্ষা মিলবে, বলছে মার্কিন এ থিংক ট্যাঙ্ক।
ইস্ফাহান পারমাণবিক স্থাপনায় একটি নতুন ছাদও নির্মিত হয়েছে। গত বছর ইসরায়েলি হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত এ ভবনে সেন্ট্রিফিউজ তৈরি হত হলে ধারণা করা হয়।
একই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনার মাটির উপরের অংশেও নতুন কাজ দেখা গেছে। ডিসেম্বরের শুরুর দিক থেকে জানুয়ারির মধ্যে ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ প্রকল্পটির ক্ষতিগ্রস্ত একটি ড্রোনরোধী খাঁচার ওপর নতুন ছাদ নির্মিত হয়েছে।
নিচে কী হচ্ছে, পর্যবেক্ষণকারী কেউ যেন তা দেখতে না পারে তা নিশ্চিত করতেই ইরান ওই ছাদ বানিয়েছে বলে অনুমান আইএসআইএসের।
“হামলা হচ্ছে ধরে নিয়েই কাজ করছে ইরান, যেন স্থাপনাগুলোকে যতটা সম্ভব সুরক্ষিত রাখা যায়। ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ধ্বংস করা যায়নি। আপনার যখন এ সংক্রান্ত, জ্ঞান, সক্ষমতা এবং কর্মসূচি পুনরায় শুরুর প্রযুক্তি থাকবে, তখন আপনি সবসময় সবকিছু পুনর্নির্মাণ করতে পারবেন,” বলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যপ্রাচ্যবিদ্যা কর্মসূচির পরিচালক অধ্যাপক সিনা আজোদি।
বৈশ্বিক পারমাণবিক ওয়াচডগ, আন্তর্জাতিক আনবিক শক্তি সংস্থার রাফায়েল গ্রোসি বিবিসিকে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি নতুন পারমাণবিক চুক্তি সম্ভব, এবং সেটা খুবই দরকার।
গত জুনে যুক্তরাষ্ট্র বাঙ্কারবিধ্বংসী বোমা যেসব টানেল ও চেম্বারে ফেলেছিল সেসব জায়গায় এখনও ইরানের উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়ে গেছে বলে অনুমান তার। তেহরানের কাছে ৪০০ কেজির মতো উচ্চমাত্রার সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম রয়েছে, প্রযুক্তির সহায়তায় যা দিয়ে খুব অল্প সময়ের মধ্যেই পারমাণবিক অস্ত্র বানিয়ে ফেলা সম্ভব।






















