ইরানের বিরুদ্ধে বিমান হামলা জোরালো করতে ইরাকের মরুভূমিতে একটি অত্যন্ত গোপন সামরিক আউটোপোস্ট বা ঘাঁটি তৈরি করেছিল ইসরায়েল। এই ঘাঁটির অস্তিত্ব গোপন রাখতে তারা এমনকি ইরাকি বাহিনীর ওপরও বিমান হামলা চালিয়েছে। মার্কিন কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
সূত্রগুলো জানায়, যুদ্ধের ঠিক আগমুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের সম্মতিতে ইসরায়েল এই স্থাপনাটি তৈরি করে। এটি মূলত ইসরায়েলি বিশেষ বাহিনীর আবাসস্থল এবং বিমানবাহিনীর একটি লজিস্টিক হাব বা রসদ সরবরাহের কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হতো। মূলত কোনো ইসরায়েলি পাইলট বা বিমান শত্রুপক্ষের এলাকায় বিধ্বস্ত হলে যেন দ্রুত উদ্ধার অভিযান (সার্চ-অ্যান্ড-রেসকিউ) চালানো যায়, সেজন্যই সেখানে উদ্ধারকারী দল মোতায়েন রাখা হয়েছিল। যদিও এখন পর্যন্ত কোনো ইসরায়েলি পাইলটকে উদ্ধার করার প্রয়োজন পড়েনি।
তবে এপ্রিলের শুরুতে ইরানের ইসফাহানের কাছে যখন একটি মার্কিন এফ-১৫ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়, তখন ইসরায়েল সহায়তার প্রস্তাব দিয়েছিল। শেষ পর্যন্ত মার্কিন বাহিনী নিজেরাই তাদের দুই বৈমানিককে উদ্ধার করে। ওই উদ্ধার অভিযান চলাকালীন সুরক্ষামূলক বিমান হামলা চালিয়ে ইসরায়েল সহায়তা করেছিল।
মার্চের শুরুতে ইসরায়েলি এই ঘাঁটিটি প্রায় আবিষ্কৃত হতে যাচ্ছিল। ইরাকি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানায়, এক স্থানীয় মেষপালক ওই এলাকায় হেলিকপ্টার উড্ডয়নসহ অস্বাভাবিক সামরিক তৎপরতার কথা জানায়। এরপর ইরাকি সামরিক বাহিনী বিষয়টি তদন্ত করতে সেনা পাঠায়। তখন ইসরায়েল বিমান হামলা চালিয়ে ইরাকি সেনাদের ওই স্থান থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। ইসরায়েলি সামরিক বাহিনী এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হয়নি। ইরাকি সরকার তখন এই হামলার নিন্দা জানিয়েছিল, যাতে একজন ইরাকি সেনা নিহত হন।
যৌথ অপারেশন কমান্ডের ডেপুটি কমান্ডার লেফটেনেন্ট জেনারেল কায়েস আল-মুহাম্মাদাওয়ি তখন রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেছিলেন, ‘এই হঠকারী অভিযান কোনো সমন্বয় বা অনুমোদন ছাড়াই পরিচালিত হয়েছিল।’ পরবর্তীতে মার্চ মাসে ইরাক এ বিষয়ে জাতিসংঘে একটি অভিযোগ জমা দেয়। সেখানে তারা এই হামলার জন্য যুক্তরাষ্ট্রকে দায়ী করেছিল। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে যে, ওই হামলায় যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না। এই সংঘর্ষের খবর ইরাকি ও আরব সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক প্রচার পায় এবং হামলাকারী কারা তা নিয়ে নানা জল্পনা শুরু হয়।
মেষপালকের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে ইরাকি সেনারা ভোরে ‘হামভি’ গাড়ি নিয়ে ওই স্থানের দিকে রওনা হয়। জেনারেল মুহাম্মাদাওয়ি জানান, দলটি সেখানে পৌঁছালে তীব্র হামলার শিকার হয়, যাতে একজন সেনা নিহত ও দুইজন আহত হন। এরপর ইরাকি কর্তৃপক্ষ ওই এলাকায় তল্লাশি চালাতে ‘কাউন্টার টেররিজম সার্ভিস’-এর আরও দুটি ইউনিট পাঠায়। যারা সেখানে সামরিক উপস্থিতির প্রমাণ পায়।
মুহাম্মাদাওয়ি রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে হামলার আগে সেখানে একটি স্থলবাহিনী মোতায়েন ছিল, যাদের আকাশপথ থেকে সহায়তা দেওয়া হচ্ছিল এবং তাদের সক্ষমতা আমাদের ইউনিটগুলোর চেয়ে অনেক বেশি ছিল।’
ইরাকি সরকারের একজন মুখপাত্র এই ঘটনা বা ইসরায়েলি ঘাঁটির বিষয়ে নতুন করে আর কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
ইরাকের মরুভূমিতে এই ঘাঁটির অবস্থান এবং এটি রক্ষায় ইসরায়েলের নেওয়া ঝুঁকির চিত্র থেকে বোঝা যায় যে, দেশটি ১ হাজার মাইল দূরে থাকা শত্রুর বিরুদ্ধে কীভাবে সফলভাবে যুদ্ধ চালিয়েছে। ইরাকে এই ঘাঁটির কারণে ইসরায়েল যুদ্ধক্ষেত্রের আরও কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল। সূত্রগুলো বলছে, জরুরি উদ্ধার অভিযান দ্রুত পরিচালনা করতে তারা সেখানে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করেছিল।
নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধের আগে এ ধরনের সাময়িক অপারেশনাল সাইট বা ঘাঁটি তৈরি করা মার্কিন বাহিনীর ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এমনকি এপ্রিলের শুরুতে বিধ্বস্ত মার্কিন বৈমানিকদের উদ্ধার করতে ইরানের ভেতরেও একটি সাময়িক ফরোয়ার্ড অপারেটিং বেস তৈরি করা হয়েছিল। সেখানে আটকে পড়া কিছু বিমান ও হেলিকপ্টার পরে মার্কিন বাহিনী নিজেরাই ধ্বংস করে দেয়।
কৌশলগত পরামর্শদাতা সংস্থা ‘হরাইজন এনগেজ’-এর গবেষণা প্রধান মাইকেল নাইটস বলেন, ‘অভিযানের আগে এই ধরনের এলাকাগুলো পরিদর্শন করা এবং অবস্থান তৈরি করা স্বাভাবিক।’ তিনি জানান, ইরাকের পশ্চিম মরুভূমি এলাকা অত্যন্ত বিশাল এবং জনবসতিহীন হওয়ায় এটি গোপন আউটোপোস্ট স্থাপনের জন্য আদর্শ জায়গা। ১৯৯১ ও ২০০৩ সালেও সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযানের সময় মার্কিন বিশেষ বাহিনী এই এলাকাটি ব্যবহার করেছিল।
নাইটস বলেন, ইরাকি মরুভূমির বাসিন্দারা বছরের পর বছর ধরে আইএস থেকে শুরু করে বিশেষ বাহিনী—সবারই অদ্ভুত সব তৎপরতা দেখেছে এবং তারা এগুলো থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করে। তবে স্থানীয়রা বর্তমান যুদ্ধের সময়ও সেখানে অস্বাভাবিক হেলিকপ্টার চলাচলের কথা তাঁকে জানিয়েছে।
ইসরায়েলি কর্মকর্তারাও যুদ্ধের সময় গোপন অভিযানের ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। মার্চের শুরুতে ইসরায়েলি বিমানবাহিনীর বিদায়ী প্রধান তোমের বার তার বাহিনীর সদস্যদের কাছে একটি চিঠি লিখেছিলেন। সেখানে তিনি উল্লেখ করেন, ‘আজকাল বিমানবাহিনীর বিশেষ ইউনিটের যোদ্ধারা এমন সব বিশেষ মিশন পরিচালনা করছে যা কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে।’ তোমের বার মে মাসের শুরুতে বিমানবাহিনী প্রধান হিসেবে তার মেয়াদ শেষ করেন।


















