ভারতের শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার এবং শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে শুরু হওয়া আন্দোলন এখন জাতীয় ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। রাজধানী দিল্লিকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ ইতোমধ্যে কেরালাসহ দেশের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়েছে।
আন্দোলনের নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণদের সংগঠন কাকরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি)। এ নিয়ে বর্তমান শাসক দল বিজেপি নজিরবিহীন চাপের মুখে পড়েছে। এমনকি এই আন্দোলন কোন দিকে গিয়ে শেষ হবে, তারও কোনো ঠিকানা নেই।
সোমবার (২০ জুলাই) পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ এবং আন্দোলনকারীদের ওপর লাঠিচার্জের পর মঙ্গলবার (২১ জুলাই) আবারও হাজারো মানুষ দিল্লির জন্তর মন্তরে জড়ো হন।
এই প্রতিবাদকারীরা গত এক মাস ধরে দিল্লির ৩০০ বছরের পুরনো পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র ‘জন্তর মন্তরে’ অবস্থান করছেন। ২৮ জুন অ্যাক্টিভিস্ট ও শিক্ষাবিদ সোনম ওয়াংচুক তাদের সাথে যোগ দিয়ে দাবির সমর্থনে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করলে এটি আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করে। গত শনিবার পুলিশ তাকে জোরপূর্বক প্রতিবাদস্থল থেকে সরিয়ে হাসপাতালে নিয়ে যায়, যেখানে তিনি এখনও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
এই আন্দোলনটি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদীর বিরুদ্ধে সর্বজনীন অসন্তোষ প্রকাশের অন্যতম স্পষ্ট ও দৃশ্যমান প্রতীকে পরিণত হয়েছে।
ওয়াংচুক এবং সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে বেশিরভাগ প্রধান বিরোধী দল, কৃষক নেতা, অ্যাক্টিভিস্ট এবং বলিউড তারকা সহ বিভিন্ন বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সমর্থন দিয়েছেন।
একই সময়ে কেরালাসহ কয়েকটি রাজ্যেও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। কেরালায় আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে জলকামান ব্যবহার করে নিরাপত্তা বাহিনী।
সোমবার পার্লামেন্ট অভিমুখে পদযাত্রার চেষ্টা করলে আন্দোলনকারীদের বাধা দেয় পুলিশ। এ সময় কাঁদানে গ্যাস ও লাঠিচার্জে অন্তত ৬০ জন আহত হন। পুলিশ আন্দোলনস্থলের অস্থায়ী মঞ্চ ও তাঁবুও সরিয়ে দেয়।
দিল্লি পুলিশের দাবি, সংঘর্ষে তাদের ১১৮ সদস্য আহত হয়েছেন এবং ৭০ জন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়েছে। পুলিশের অভিযোগ, বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভাঙার চেষ্টা, পাথর নিক্ষেপ ও সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর করেছে। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সিজেপি বলেছে, বিনা উসকানিতে পুলিশই প্রথম হামলা চালিয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন ভিডিওতে নারী-পুরুষ আন্দোলনকারীদের মারধর এবং আহত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখা যায়। এসব ঘটনার পর আন্দোলন আরও তীব্র হওয়ার আভাস দিয়েছে সিজেপি।
আন্দোলনের অন্যতম মুখ শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মী সোনম ওয়াংচুক গত ২৮ জুন জন্তর মন্তরে অনির্দিষ্টকালের অনশন শুরু করেন। শনিবার পুলিশ তাকে সেখান থেকে হাসপাতালে নিয়ে গেলেও তিনি অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন।
বিরোধী দল কংগ্রেসসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, কৃষক সংগঠন, সামাজিক কর্মী এবং কয়েকজন বলিউড তারকা আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী শিক্ষার্থীদের দাবিকে যৌক্তিক উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে “ভারতের ইতিহাসের সবচেয়ে যুববিরোধী প্রধানমন্ত্রী” বলে মন্তব্য করেছেন।
ক্রমবর্ধমান চাপের মুখে সোমবার আন্দোলনকারীদের কয়েকজন প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করেন কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্যমন্ত্রী ও বিজেপির শীর্ষ নেতা জেপি নাড্ডা। তিনি বৈঠককে সৌহার্দ্যপূর্ণ বলে উল্লেখ করলেও আন্দোলনকারীরা জানান, তাদের দাবির বিষয়ে কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দেওয়া হয়নি।
সিজেপির মুখপাত্র সৌরভ দাস বলেন, সরকার শুধু বিষয়টি বিবেচনার আশ্বাস দিয়েছে। অন্য নেতা আশুতোষ রাঙ্কা বৈঠককে “সময় নষ্ট” বলে মন্তব্য করেন।
আন্দোলনের মূল দাবি ভারতের শিক্ষা ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার এবং ন্যাশনাল এলিজিবিলিটি কাম এন্ট্রান্স টেস্ট (NEET)-এর প্রশ্নফাঁসের ঘটনায় দায় স্বীকার করে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ।
গত ৩ মে অনুষ্ঠিত নিট পরীক্ষায় প্রায় ২২ লাখ ৮০ হাজার পরীক্ষার্থী অংশ নেন। প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ ওঠার পর পরীক্ষা বাতিল করে পুনরায় আয়োজন করা হয়। আন্দোলনকারীদের দাবি, এই ঘটনায় মানসিক চাপে পড়ে ২০ জনের বেশি শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
তবে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগের দাবি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি আন্দোলনকারীদের ‘বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বি-টিম’ বলে মন্তব্য করেন।
পুলিশি অভিযান, দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়া বিক্ষোভ এবং সরকারের ওপর বাড়তে থাকা চাপের মধ্যে আন্দোলনটি এখন ভারতের অন্যতম আলোচিত রাজনৈতিক ও সামাজিক ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।




















