যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস অঙ্গরাজ্যের লওয়েল। আইলিন ক্যাসলের বাড়ির সামনে থাকা সুইমিং পুলটি একসময় আশপাশের শিশুদের জন্য গ্রীষ্মে স্বস্তির আশ্রয় ছিল। কিন্তু চলতি সপ্তাহে তাপমাত্রা অনেক বেড়ে গেলেও ৮২ বছর বয়সী ক্যাসল পুলে পানি না ভরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
কারণ হিসেবে বার্তা সংস্থা এপি-কে তিনি জানান, বাড়ির পেছনে থাকা ডাটা সেন্টারটিতে রয়েছে শিল্পকারখানার মতো বড় বড় এয়ার কন্ডিশনার। সেখানে সারাক্ষণ শব্দ করছে এবং ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটর থেকে মাঝে মাঝে বের হয় ধোঁয়া।
নিজের বাড়ির বারান্দায় বসে পাশ দিয়ে সাইকেল চালিয়ে যাওয়া শিশুদের দিকে তাকিয়ে ক্যাসল বলেন, ‘আমি বাতাসের মান, পানির অবস্থা—এসব নিয়ে ভাবি। এলাকার বাচ্চাদের ওপর এর কী প্রভাব পড়ছে, সেটাও ভাবি।’
যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বাঞ্চলজুড়ে এখন তীব্র তাপপ্রবাহ বইছে। আর এসময় ডাটা সেন্টারগুলোয় বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যায়। এতে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর চাপ আরো বাড়ে, যা আশপাশের এলাকার বায়ুদূষণও বাড়তে পারে। ম্যাসাচুসেটসের জাতিগতভাবে বৈচিত্র্যময় স্যাক্রেড হার্ট এলাকায় এর প্রভাব স্পষ্ট হওয়ায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) শিল্পের দ্রুত বিস্তার নিয়ে বিতর্ক আরো জোরালো হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে ডাটা সেন্টারকে ক্রমেই বিভিন্ন ধরনের পরিবেশগত সমস্যার জন্য দায়ী করা হচ্ছে। প্রযুক্তি খাতের অনেকের মতে, এআই-নির্ভর অর্থনীতি ও সমাজের পরিবর্তন নিয়ে মানুষের বিস্তৃত উদ্বেগের প্রতীক হয়ে উঠেছে এসব স্থাপনা।
প্রচণ্ড গরমের দিনে ক্যাসলের এলাকায় এর প্রভাব চোখে পড়ার মতো। ম্যাসাচুসেটস সরকার স্যাক্রেড হার্ট এলাকাকে এমন একটি অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করেছে, যেখানে ঐতিহাসিকভাবেই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর বসবাস। এ কারণে পরিবেশ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
লওয়েলের ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা তারা হং বলেন, ‘এখানে মূলত নিম্ন আয়ের এবং শ্রমজীবী পরিবারগুলো বসবাস করে। তারা প্রতিদিন কঠোর পরিশ্রম করে পরিবারের খাবারের ব্যবস্থা করার চেষ্টা করেন। এটি খুবই অন্তর্ভুক্তিমূলক একটি এলাকা, আর সেই এলাকার একেবারে মাঝখানে ডাটা সেন্টারটি দাঁড়িয়ে আছে।’
তাপপ্রবাহে বাড়ে বিদ্যুৎ ও পানির চাহিদা
এআইয়ের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে গবেষণা করেছেন ইউনিভার্সিটি অব ক্যালিফোর্নিয়া, রিভারসাইডের অধ্যাপক শাওলেই রেন। তিনি বলেন, ‘ডাটা সেন্টার পরিচালনার জন্য তাপপ্রবাহ প্রায় সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি।’
রেন বলেন, ডাটা সেন্টারের সারি সারি কম্পিউটার সার্ভার প্রচুর তাপ উৎপন্ন করে। এগুলোকে নিরবচ্ছিন্নভাবে সচল রাখতে মূলত দুটি পদ্ধতি ব্যবহৃত হয়— বিপুল বিদ্যুৎ ব্যবহারকারী রেফ্রিজারেশনভিত্তিক কুলিং এবং প্রচুর পানির প্রয়োজন হয় এমন বাষ্পীভবনভিত্তিক কুলিং।
তার ভাষ্য, বিদ্যুৎ বিভ্রাটের আশঙ্কা কমাতে কিছু ডাটা সেন্টার সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে ব্যাকআপ ডিজেল জেনারেটর চালু করে। আবার বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়লে গ্রিড পরিচালনাকারী সংস্থাগুলো শেষ বিকল্প হিসেবে ডাটা সেন্টারগুলোকে নিজস্ব জেনারেটর চালাতে বলতে পারে।
তিনি বলেন, অল্প সময়ের জন্য হলেও ডিজেল নিঃসরণ মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। তাপপ্রবাহের সময় যদি একসঙ্গে অনেক ডিজেল জেনারেটর চালু হয়, তাহলে স্থানীয় বায়ুর মানের জন্য তা ‘বিপর্যয়কর’ হতে পারে।
লওয়েলের ডাটা সেন্টার পরিচালনাকারী মার্কলি গ্রুপ জানিয়েছে, বায়ুর মান উন্নত করতে তারা আশপাশে ২ হাজারের বেশি গাছ লাগিয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী জেফ মার্কলি এক বিবৃতিতে বলেন, জরুরি পরিস্থিতি ছাড়া খুব কমই জেনারেটর চালু করতে হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমরা এগুলো আগেভাগে বা দীর্ঘ সময়ের জন্য চালাই না। শুধু প্রকৃত বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় গুরুত্বপূর্ণ সিস্টেম সচল রাখতে জেনারেটর চালানো হয়। এছাড়া সপ্তাহে একবার প্রতিটি জেনারেটর প্রায় পাঁচ মিনিট পরীক্ষা করা হয় এবং একবারে একটি জেনারেটরই চালানো হয়।’
স্প্যাগেটি কারখানার জায়গায় গড়ে ওঠে ডাটা সেন্টার
জেফ মার্কলি জানান, উনিশ শতকের শিল্পবিপ্লবের সময় মেরিম্যাক নদীর পানি বস্ত্রকলগুলো চালাতে ব্যবহৃত হতো। সেই একই নদীর পর্যাপ্ত পানির সরবরাহের কারণেই তিনি লওয়েলকে বেছে নেন।
তার ভাষ্য, গ্রীষ্মের সবচেয়ে গরম সময়ে ডাটা সেন্টারটি দিনে প্রায় ১ লাখ ১৮ হাজার গ্যালন পানি ব্যবহার করে, যা শহরের মোট দৈনিক পানি ব্যবহারের তুলনায় খুবই সামান্য।
লওয়েলে শৈশব থেকে আছেন আইলিন ক্যাসল। এক দশক আগে পরিত্যক্ত প্রিন্স স্প্যাগেটি কারখানার জায়গায় মার্কলি গ্রুপ ডাটা সেন্টার নির্মাণ শুরু করলে স্বাগত জানিয়েছিলেন। কিন্তু প্রায় দুই বছর আগে তার বাড়ির পেছনে সুইমিং পুলের পাশে দ্বিতীয় কুলিং ট্যাংক স্থাপন এবং নজরদারি ক্যামেরা বাড়ানোর পর সেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে।
বাড়তে থাকা জনবিরোধিতার মুখে গত ফেব্রুয়ারিতে লওয়েল সিটি কাউন্সিল ১০-০ ভোটে এক বছরের জন্য নতুন ডাটা সেন্টার সম্প্রসারণে স্থগিতাদেশ (মোরাটোরিয়াম) জারি করে।
জাতীয় নয়, স্থানীয় সমস্যা বেশি
জোনাথন কুমি ৩০ বছর ধরে ডাটা সেন্টার নিয়ে গবেষণা করছেন। তার মতে, গত কয়েক বছরে ডাটা সেন্টারের বিদ্যুৎ ব্যবহার বেড়েছে। তবে এটি ‘মূলত স্থানীয় ঘটনা’।
কুমি বলেন, জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা তুলনামূলকভাবে মাঝারি হারে বেড়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে এতে বড় ধরনের পরিবর্তনের সম্ভাবনা দেখছেন না। তাই বলছেন, ‘এটি কোনো জাতীয় সংকট নয়। সারা দেশে বিস্ফোরণধর্মী প্রবৃদ্ধিও ঘটছে না।’
তবে তিনি বলেন, যেসব এলাকায় ডাটা সেন্টার রয়েছে, সেখানে পরিবেশগত ক্ষতি, স্থানীয় অর্থনৈতিক প্রভাব, যানজটসহ নানা বিষয় বিবেচনায় নেয়া জরুরি।
তাপমাত্রা যখন ১০০ ডিগ্রি ফারেনহাইটের ওপরে উঠে যায় তখন ডাটা সেন্টারের ভেতরের তাপ বাইরে বের করে দেয়া আরো কঠিন হয়ে পড়ে। চলতি সপ্তাহে নিউ ইংল্যান্ডে তাপমাত্রার এ পূর্বাভাস ছিল।
ফলে সার্ভার ঠান্ডা রাখতে আরো বেশি বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়, যেমনটি বাণিজ্যিক ভবন বা আবাসিক বাড়ির ক্ষেত্রেও ঘটে। এতে বিদ্যুৎ গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়ে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের ‘বাস্তব ঝুঁকি’ তৈরি হয় বলে জানান কুমি।
তিনি বলেন, সাধারণ গ্রীষ্মকালে অসংখ্য মানুষ একসঙ্গে বাসার এয়ার কন্ডিশনার চালালে যে চাপ তৈরি হয়, ডাটা সেন্টারের চাপ তার থেকে ভিন্ন।
‘ব্যক্তিগতভাবে অনেক ছোট ছোট লোডের বদলে ডাটা সেন্টারগুলো নিজেরাই বিশাল বিদ্যুৎ গ্রাহক। তাই এগুলো কখন চালু বা বন্ধ হবে, তা সমন্বয় করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সবগুলো একসঙ্গে চালু বা বন্ধ না হয়ে যায়।’
সম্প্রতি নর্থ আমেরিকান ইলেকট্রিক রিলায়েবিলিটি করপোরেশন (এনইআরসি) এআই ডাটা সেন্টারের কারণে ‘বড় বিদ্যুৎ গ্রাহকের নজিরবিহীন বৃদ্ধি’ নিয়ে সতর্কবার্তা জারি করেছে। একই সঙ্গে এসব ডাটা সেন্টার থেকে সৃষ্ট ‘তাৎক্ষণিক ঝুঁকি’ কমাতে নির্দেশিকাও প্রকাশ করেছে।
ডাটা সেন্টার নিয়ে উত্তেজনা চরমে
লওয়েলে ডাটা সেন্টার নিয়ে উত্তেজনা চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। কয়েক দিন আগে নগর কর্তৃপক্ষ আয়োজিত গণশুনানিতে কথা বলার সময় বাধা দেয়ায় পুলিশ সাময়িকভাবে ১৪ বছর বয়সী এক কিশোরীকে আটক করে।
গত সোমবার একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অডিটোরিয়াম থেকে পুলিশ বের করে নিয়ে যাওয়ার সময় ওই কিশোরী চিৎকার করে বলছিল, ‘আমি তো কারো ক্ষতি করছি না। আমরা শুধু ডাটা সেন্টার চাই না!’
ডাটা সেন্টারের বিরোধীদের একটি জোটের সঙ্গে মার্কলি গ্রুপের হয়ে কাজ করা ইলেকট্রিশিয়ান ও অন্য সমর্থকদের বিরোধও দিন দিন বাড়ছে। সমর্থকদের দাবি, এ ডাটা সেন্টারের মাধ্যমে লওয়েলের সঙ্গে প্রযুক্তি শিল্পের সম্পর্ক আরো শক্তিশালী হয়েছে।
বিতর্কিত ওই বৈঠকে পুলিশ ডাকার এবং পরে কিশোরীটিকে সরানোর নির্দেশ দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়েন নির্দলীয় মেয়র এরিক গিটশিয়ার। স্থানীয় রেডিও স্টেশন ডব্লিউসিএপি-কে তিনি বলেন, তখন কিশোরীর বয়স জানতেন না। সভায় শৃঙ্খলা বজায় রাখার চেষ্টা করেছেন বলেও দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘সেদিন প্রচণ্ড গরম ছিল। মানুষ খুব আবেগপ্রবণ ছিল এবং চিৎকার করছিল সবাই।’




















