মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান এনভিডিয়ার তৈরি অন্যতম শক্তিশালী এআই প্রসেসর ‘এইচ২০০’ চিপের একটি ছোট চালান ইতিমধ্যে চীনে পাঠানো হয়েছে। মঙ্গলবার (১৪ জুলাই) মার্কিন কংগ্রেসের হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির সামনে এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের শিল্প ও নিরাপত্তা বিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি জেফরি কেসলার।
কমিটির শুনানিতে কেসলার বলেন, “চীনে এইচ২০০ চিপের রপ্তানি এখন পর্যন্ত খুবই ন্যূনতম বা সীমিত পর্যায়ে রয়েছে।” তিনি জানান যে চিপের চালান পাঠানো শুরু হলেও এর সংখ্যা ছিল “একেবারেই সামান্য”।
মঙ্গলবার রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে জানানো হয়, টেলিকম সরঞ্জাম প্রস্তুতকারী চীনা প্রতিষ্ঠান জেডটিই কর্পোরেশনের এর একটি সহযোগী প্রতিষ্ঠানসহ আরও দুটি চীনা কোম্পানি এনভিডিয়া এবং এএমডির তৈরি উন্নত এআই চিপ কেনার জন্য মার্কিন সরকারের কাছ থেকে সর্বশেষ অনুমোদন পেয়েছে। এর আগে মে মাসে রয়টার্স জানিয়েছিল যে বাণিজ্য বিভাগ আলিবাবা, টেনসেন্ট এবং বাইটড্যান্সসহ প্রায় ১০টি চীনা প্রতিষ্ঠানকে এই এইচ২০০ চিপ কেনার অনুমোদন দিলেও সে সময় কোনো চিপ সরবরাহ করা হয়নি।
চীনের কাছে এনভিডিয়ার এইচ২০০ চিপ বিক্রি করার এই বিষয়টি বর্তমান ইউএস-চীন প্রযুক্তিগত শীতল যুদ্ধের একটি অন্যতম সংবেদনশীল পয়েন্ট হয়ে দাঁড়িয়েছে। বেইজিং যেন এই ধরনের অত্যাধুনিক চিপ সামরিক ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে না পারে, সেজন্য ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরে এই চিপের ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপের চেষ্টা করে আসছে।
হাউজ ফরেন অ্যাফেয়ার্স কমিটির শীর্ষ ডেমোক্র্যাট সদস্য গ্রেগরি মিকস মঙ্গলবার কড়া সমালোচনা করে বলেন, বাণিজ্য বিভাগ গত বছরের অক্টোবর থেকে কোনো চীনা কোম্পানিকে তাদের রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ বা কালো তালিকায় যুক্ত করেনি, যা গত এক দশকের মধ্যে দীর্ঘতম সময়। তিনি অভিযোগ তোলেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প “রপ্তানি নিয়ন্ত্রণকে চীনের সাথে সামগ্রিক দর কষাকষির একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করছেন এবং চীনে উন্নত এআই চিপের লাইসেন্স অনুমোদন দিয়ে বর্তমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে দুর্বল করছেন।”
তবে বাণিজ্য বিভাগের কর্মকর্তা কেসলার এই অভিযোগের জবাবে তাদের অবস্থান ডিফেন্ড করেন এবং বলেন যে নিষেধাজ্ঞার মুখে থাকা চীনা কোম্পানিগুলোর বর্তমান তালিকাটি কঠোরভাবে কার্যকর করাই এখন সবচেয়ে বড় বিষয়।
চিপ ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা খাতের জন্য ভবিষ্যতে আরও নতুন নিয়ন্ত্রক আইন আসছে বলে জানান কেসলার। তবে তিনি বাইডেন প্রশাসনের আমলের বৈশ্বিক এআই চিপ অ্যাক্সেস নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত ‘ডিফিউশন রুল’ পরিবর্তনের সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেন, ওই নিয়মটি পুরো বৈশ্বিক এআই ইকোসিস্টেমকে বাধাগ্রস্ত করত।
শুনানিতে রিপাবলিকান প্রতিনিধি বিল হুইজেঙ্গা বাণিজ্য বিভাগের গত ৩১ মে’র একটি নির্দেশিকা নিয়ে কেসলারের তীব্র সমালোচনা করেন। ওই নির্দেশিকায় একটি আইনি ফাঁকফোকরের ইঙ্গিত ছিল, যার মাধ্যমে চীনের বাইরে থাকা চীনা সাবসিডিয়ারি (সহযোগী) কোম্পানিগুলো এনভিডিয়ার ‘ব্ল্যাকওয়েল’ চিপ সংগ্রহ করার সুযোগ পেতে পারে—যা এইচ২০০ চিপের চেয়েও অনেক বেশি উন্নত ও শক্তিশালী।
হুইজেঙ্গা প্রশ্ন তোলেন, কেন বাণিজ্য বিভাগের গাইডলাইনে বলা হলো যে চীনা কোম্পানিগুলো চোরাচালান বা অন্য কোনো ফাঁকফোকর দিয়ে পাওয়া ব্ল্যাকওয়েল চিপগুলো নিজেদের কাছে রেখে দিতে পারবে? জবাবে কেসলার বলেন, লাইসেন্স ছাড়া চিপ পেয়ে থাকলে কোম্পানিগুলোর উচিত এই লঙ্ঘনের কথা নিজেরাই প্রকাশ করা। তবে হুইজেঙ্গা এই জবাবকে সম্পূর্ণ “অগ্রহণযোগ্য ও গোলকধাঁধাপূর্ণ কথা” বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
শুনানিতে কেসলার সংযুক্ত আরব আমিরাতের ওপর থেকে ট্রাম্প প্রশাসনের চিপ রপ্তানি নিয়ন্ত্রণ শিথিল করার সিদ্ধান্তটিকেও সমর্থন করেন। এর ফলে আমিরাতে এনভিডিয়ার এআই চিপ, সামরিক সরঞ্জাম ও বাণিজ্যিক স্যাটেলাইট রপ্তানি সহজ হবে, যা দুই দেশের মিত্রতাকে আরও জোরদার করবে।
উল্লেখ্য, গত মাসে রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় যে বেইজিংয়ের সাথে সম্পর্কের বড় ধরণের অবনতি এড়াতে ট্রাম্প প্রশাসন চীনের উদীয়মান এআই স্টার্টআপ ‘ডিপসিক’, মেমোরি চিপ নির্মাতা ‘চ্যাংক্সিন মেমোরি টেকনোলজিস’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ এমন আরও ১০০-র বেশি কোম্পানিকে তাদের মূল কালো তালিকা বা ‘এনটিটি লিস্ট’-এ যুক্ত করা থেকে বিরত রয়েছে। লাইসেন্স ছাড়া এই তালিকায় থাকা কোম্পানিগুলোতে কোনো মার্কিন প্রযুক্তি বা সফটওয়্যার সরবরাহ করা নিষিদ্ধ।


















