জোরপূর্বক শ্রমে উৎপাদিত পণ্যের ওপর নিষেধাজ্ঞা যথাযথভাবে কার্যকর না করার অভিযোগে বাংলাদেশ এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ (ইইউ) বিশ্বের ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের পণ্যের ওপর নতুন করে ১০ ও ১২ দশমিক ৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে ট্রাম্প প্রশাসন। শুক্রবার (২৪ জুলাই) থেকেই আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ক্ষেত্রে বিতর্কিত এই শুল্ক কার্যকর হচ্ছে।
একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে পূর্বে আরোপিত বৈশ্বিক সাময়িক ১০ শতাংশ শুল্কের মেয়াদও শেষ হচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য ঘাটতি কমানোর লক্ষ্যে গত বছর আন্তর্জাতিক জরুরি অর্থনৈতিক ক্ষমতা আইনের (IEEPA) আওতায় বিভিন্ন দেশের পণ্যে ১০ থেকে ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ‘পারস্পরিক’ শুল্ক আরোপ করেছিলেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তবে চলতি ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট সেই শুল্ক বাতিল ঘোষণা করেন। সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর ট্রাম্প প্রশাসন ১৫০ দিনের জন্য অস্থায়ীভাবে যে ১০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছিল, তা যুক্তরাষ্ট্রের স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হচ্ছে। সেই আইনি শূন্যতা মেটাতে এবং নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে নতুন নোটিশ জারি করল হোয়াইট হাউস।
সেকশন ৩০১-এর আইনি আইল ও পরিধি
বৃহস্পতিবার যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফেডারেল রেজিস্টার’-এ প্রকাশিত এক নোটিশে নতুন শুল্কের ঘোষণা দেওয়া হয়। এবার ১৯৭৪ সালের বিখ্যাত মার্কিন ট্রেড অ্যাক্টের ‘সেকশন ৩০১’-এর আওতায় এই শুল্ক ধার্য করা হয়েছে। ইতিপূর্বে আদালতের বিভিন্ন চ্যালেঞ্জেও সেকশন ৩০১-এর আওতায় নেওয়া পদক্ষেপ বহাল থাকায়, আইনি দিক থেকেও ট্রাম্প প্রশাসনের এই নতুন চাল আগের চেয়ে বেশি টেকসই বলে মনে করছেন বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।
নোটিশ অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হওয়া প্রায় ৯৯ দশমিক ৪ শতাংশ পণ্যের ওপরই নতুন এই সর্বনিম্ন শুল্কহার প্রযোজ্য হবে। তবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তেল, গ্যাস, সার এবং নির্দিষ্ট কিছু নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যকে এই শুল্কের আওতার বাইরে বা ছাড় দেওয়া হয়েছে।
ট্রাম্প প্রশাসন জানিয়েছে, যেসব পণ্য ২৪ জুলাইয়ের আগে থেকেই যুক্তরাষ্ট্রে পরিবহন বা জাহাজীকরণ (Shipment) করা হয়েছে, সেগুলো আগামী ২৮ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিট পর্যন্ত এই নতুন শুল্ক ছাড়ের সুবিধা পাবে।
জোরপূর্বক শ্রম ও মার্কিন বক্তব্য
শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্য প্রতিনিধি (USTR) জেমিসন গ্রিয়ার এক বিবৃতিতে বলেন, “প্রায় এক শতাব্দী ধরে যুক্তরাষ্ট্রে জোরপূর্বক শ্রমে তৈরি পণ্য আমদানির ওপর স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রয়েছে এবং আমরা তা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছি। আমাদের বাণিজ্যিক অংশীদারদের একই পদক্ষেপ নেওয়ার সময় আরও অনেক আগেই পেরিয়ে গেছে।”
তিনি আরও যোগ করেন, “আজকের এই কঠোর পদক্ষেপ মানবাধিকার লঙ্ঘন ও বিশ্ববাণিজ্য বিকৃতকারী অনৈতিক চর্চা বন্ধ করার নতুন সূচনা করবে এবং বিশ্বজুড়ে খেটে খাওয়া শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষায় সহায়তা করবে।”
গ্রিয়ার স্পষ্ট করেন যে, যেসব দেশের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের নির্দিষ্ট শুল্কসীমা বেঁধে দেওয়ার দ্বিপাক্ষিক চুক্তি রয়েছে, নতুন শুল্কের কারণে তাদের নির্ধারিত সেই সর্বোচ্চ সীমা অতিক্রম করা হবে না।
কোন দেশের কত শুল্ক
চূড়ান্ত ঘোষণা অনুযায়ী:
১০ শতাংশ শুল্ক: বাংলাদেশ, ভারত, আর্জেন্টিনা, যুক্তরাজ্য, কম্বোডিয়া, কানাডা, ইকুয়েডর, এল সালভাদর, গুয়াতেমালা, হন্ডুরাস, ইন্দোনেশিয়া, জর্ডান, মালয়েশিয়া, মেক্সিকো, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা এবং ত্রিনিদাদ ও টোবাগো।
১০ থেকে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক: ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), তাইওয়ান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া ও সুইজারল্যান্ডের ক্ষেত্রে তাদের পূর্বে কার্যকর ‘মোস্ট ফেভারড নেশন’ (MFN) শুল্কহারের সাথে নতুন হার সমন্বয় করে মোট শুল্ক ১০ অথবা ১২.৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে।
১২.৫ শতাংশ শুল্ক: চীনসহ বিশ্বের অন্য ৩৮টি দেশের পণ্যে ১২.৫ শতাংশ শুল্ক বসানো হয়েছে। বিশেষ করে উইঘুর মুসলিম সংখ্যালঘুদের শ্রমশিবিরে আটকে রাখার অভিযোগ রয়েছে চীনের বিরুদ্ধে, যদিও বেইজিং শুরু থেকেই তা অস্বীকার করে আসছে।
হোয়াইট হাউসের সূত্র জানিয়েছে, ২০২৫ সালের নভেম্বরে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ও চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সমঝোতায় নির্ধারিত ২০ শতাংশ শুল্কহারের সীমার ভেতরেই চীনের সার্বিক শুল্ক রাখার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। তবে ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে চীনা শিল্পপণ্যের ওপর আরোপিত ২৫ শতাংশ বিশেষ শুল্ক এর বাইরে অতিরিক্ত হিসেবেই বহাল থাকবে।



















