টিম কুকের দীর্ঘ মেয়াদের পর অ্যাপলের নেতৃত্বে পরিবর্তনের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সাংগঠনিক কাঠামো ও পণ্য উন্মোচনের কৌশলেও পরিবর্তনের আভাস পাওয়া যাচ্ছে। নতুন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) জন টার্নাসের নেতৃত্বে মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনা স্তর কমানো, প্রকৌশলীদের সঙ্গে শীর্ষ নেতৃত্বের সরাসরি যোগাযোগ বাড়ানো এবং সারা বছরজুড়ে পণ্য উন্মোচনের মতো উদ্যোগ নিয়ে কাজ চলছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
ব্লুমবার্গের প্রযুক্তিবিষয়ক সাংবাদিক মার্ক গুরম্যানের প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে জানা গেছে, টার্নাস অ্যাপলকে তুলনামূলকভাবে কম স্তরবিশিষ্ট বা ‘লীনার’ কাঠামোয় নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। এর লক্ষ্য হিসেবে দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পণ্য উন্নয়নের সময় কমানোর বিষয়টি সামনে এসেছে।
মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন
অ্যাপলের বিভিন্ন প্রকৌশল দলের সঙ্গে সমন্বয়ের দায়িত্বে থাকা ইঞ্জিনিয়ারিং প্রোগ্রাম ম্যানেজারদের (EPM) ভূমিকা ও সংখ্যা কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কিছু কর্মীকে প্রতিষ্ঠানের অন্য পদে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বিকল্প পদ না পেলে তাঁদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা রয়েছে।
অ্যাপলের কিছু দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও উন্নয়ন প্রকল্পও পুনর্মূল্যায়নের আওতায় এসেছে। বিশেষ করে সিরি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং ভিশন প্রো–সম্পর্কিত বিভিন্ন প্রকল্পের অগ্রাধিকার পুনর্নির্ধারণ করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে গ্রাহকসেবায় বড় ধরনের পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তুলনামূলক সতর্ক অবস্থান নেওয়া হচ্ছে। প্রায় ৫ হাজার অ্যাপলকেয়ার কর্মীর কাজ ব্যাপকভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর ব্যবস্থায় প্রতিস্থাপনের একটি পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হলেও, গ্রাহকসেবায় সম্ভাব্য বিঘ্নের আশঙ্কায় তা নিয়ে পুনর্বিবেচনা করা হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
সেপ্টেম্বরের একক লঞ্চ থেকে সরে আসার পরিকল্পনা
অ্যাপল দীর্ঘদিন ধরে সেপ্টেম্বরে একসঙ্গে নতুন আইফোন ও অন্যান্য পণ্য উন্মোচন করে আসছে। নতুন নেতৃত্বে সেই ধারা পরিবর্তনের সম্ভাবনাও দেখা যাচ্ছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, আইফোনের বিভিন্ন মডেলের উন্মোচন সময়ের ব্যবধান রেখে করার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। এতে নির্দিষ্ট কিছু প্রিমিয়াম মডেল আগে এবং অপেক্ষাকৃত সাধারণ বা নতুন ফর্ম-ফ্যাক্টরের মডেল পরবর্তী সময়ে বাজারে আনার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তনের ফলে অ্যাপলকে একটি নির্দিষ্ট বার্ষিক লঞ্চ-চক্রের পরিবর্তে বছরজুড়ে একাধিক পণ্য ও প্রযুক্তি বাজারে আনার সুযোগ দিতে পারে। তবে এ পরিকল্পনার পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন হলে অ্যাপলের সরবরাহব্যবস্থা, বিপণন এবং উৎপাদন পরিকল্পনাতেও পরিবর্তন প্রয়োজন হবে।
অ্যাপ স্টোরের বাইরে নতুন রাজস্বের সন্ধান
অ্যাপলের ব্যবসায়িক কৌশলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হচ্ছে সার্ভিসেস ব্যবসার সম্প্রসারণ। বিভিন্ন দেশে অ্যাপ স্টোরের অর্থপ্রদানের ব্যবস্থা ও তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ স্টোর নিয়ে নিয়ন্ত্রক চাপ বাড়ায় অ্যাপলের বিদ্যমান ব্যবসায়িক মডেলও পরিবর্তনের মুখে পড়েছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে অ্যাপ স্টোরের কমিশন কাঠামো, বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থা এবং তৃতীয় পক্ষের অ্যাপ মার্কেট নিয়ে নিয়ন্ত্রকদের সিদ্ধান্ত অ্যাপলের সার্ভিসেস ব্যবসায় প্রভাব ফেলতে পারে।
এ পরিস্থিতিতে অ্যাপলের বিপুলসংখ্যক ডিভাইস ব্যবহারকারীকে কেন্দ্র করে নতুন সাবস্ক্রিপশনভিত্তিক ডিজিটাল সেবা চালুর সম্ভাবনা নিয়ে কাজ চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। সিইও জন টার্নাসের সঙ্গে সার্ভিসেস প্রধান এডি কিউ এবং প্রধান অর্থ কর্মকর্তা কেভান পারেখ এ বিষয়ে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
তবে নতুন কোনো নির্দিষ্ট সেবা, এর মূল্য বা সম্ভাব্য বাজারে আসার সময় সম্পর্কে অ্যাপলের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এখনো পাওয়া যায়নি।
ইঞ্জিনিয়ারিং-কেন্দ্রিক নেতৃত্বের পরীক্ষা
হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা নিয়ে অ্যাপলের শীর্ষ নেতৃত্বে আসা টার্নাসের অধীনে কোম্পানির পণ্য উন্নয়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় প্রকৌশলীদের ভূমিকা আরও বাড়তে পারে। মধ্যবর্তী ব্যবস্থাপনার স্তর কমানো এবং সরাসরি যোগাযোগের ওপর জোর দেওয়ার উদ্যোগকে সেই পরিবর্তনের অংশ হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
তবে এসব পদক্ষেপ এখনো চলমান সাংগঠনিক পরিবর্তনের অংশ। ফলে এগুলোর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব অ্যাপলের পণ্য উন্নয়ন, কর্মী কাঠামো, সার্ভিসেস ব্যবসা এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধিতে কীভাবে প্রতিফলিত হবে, তা এখনই নিশ্চিতভাবে বলা যাচ্ছে না।




















