গ্লোবাল স্মার্টফোন বাজারে মোটোরোলা তাদের ফোল্ডেবল ‘রেজর’ এবং রেগুলার ক্যান্ডিবার ফোনের পোর্টফোলিও রিফ্রেশ করার কাজ প্রায় গুটিয়ে এনেছে। এরই ধারাবাহিকতায় আপার মিড-রেঞ্জ বা মাঝারি বাজেটের ক্রেতাদের জন্য অন্যতম আকর্ষণীয় ডিভাইস হিসেবে বাজারে এসেছে Motorola Edge 70 Pro। অত্যন্ত প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই প্রাইস সেগমেন্টে চমৎকার হার্ডওয়্যার, মোটোরোলার ক্লিন অ্যান্ড্রয়েড ইন্টারফেস এবং আকর্ষণীয় মূল্যের এক দারুণ কম্বিনেশন এই ফোনটি।
এক সপ্তাহেরও বেশি সময় ধরে নিবিড়ভাবে ব্যবহারের পর ফোনটির খুঁটিনাটি ভালো ও মন্দ দিক নিয়ে আমাদের এই বিশেষ রিভিউ:
ডিজাইন ও ডিসপ্লে: যেমন আকর্ষণীয়, তেমনই টেকসই
লুক ও ফিল: মোটোরোলার ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজ বরাবরই চমৎকার হয়, এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। বিশেষ করে এর Pantone Zinfandel কালারটি এককথায় অসাধারণ। মাত্র ৭.১৯ মিলিমিটার পুরু এবং অত্যন্ত হালকা এই ফোনটি হাতে ধরলে বেশ প্রিমিয়াম ফিল দেয়।
স্থায়িত্ব: ফোনটি স্লিম হলেও এর স্থায়িত্ব নিয়ে আপস করা হয়নি। এতে রয়েছে IP68/IP69 ধুলো ও পানি প্রতিরোধী রেটিং এবং MIL-STD-810H মিলিটারি গ্রেড শকপ্রুফ সার্টিফিকেশন।
ডিসপ্লে: ফোনটিতে রয়েছে একটি ৬.৭৮ ইঞ্চির বিশাল AMOLED ডিসপ্লে। সাধারণ ব্যবহারে এটি ১২০ হার্টজ এবং গেমিংয়ের সময় ১৪৪ হার্টজ রিফ্রেশ রেট সাপোর্ট করে। এর পিক ব্রাইটনেস পরিমাপ করা গেছে ২৭৩১ নিটস, যা কড়া রোদেও দারুণ ভিজিবিলিটি দেয়।
নেতিবাচক দিক: ফোনটির স্ক্রিন দুই পাশে অতিরিক্ত বাঁকানো (Curved Screen)। কার্ভড স্ক্রিনের কারণে মাঝেমধ্যেই ‘ঘোস্ট টাচ’ (Ghost Touch) বা স্ক্রিনের পাশে ভুলবশত চাপ লেগে যাওয়ার সমস্যা হয়। এছাড়া এর অপটিক্যাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট স্ক্যানারটি স্ক্রিনের বেশ খানিকটা নিচে অবস্থিত, যা ব্যবহার করা কিছুটা অস্বস্তিকর।
ক্যামেরা: চার ক্যামেরার ওয়ান-ম্যান আর্মি!
Motorola Edge 70 Pro-তে মোট চারটি 50MP ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে—যার তিনটি পেছনে এবং একটি সামনে।
মেইন ক্যামেরা: ৫০ মেগাপিক্সেলের সনি LYT-710 সেন্সর (OIS সহ)।
আল্ট্রা-ওয়াইড: ৫০ মেগাপিক্সেলের স্যামসাং ISOCELL JN5 সেন্সর (যা ম্যাক্রো ক্যামেরা হিসেবেও কাজ করে)।
টেলিফোটো: ৫০ মেগাপিক্সেলের পেরিস্কোপ লেন্স, যা ৩.৫এক্স (3.5x) অপটিক্যাল জুম সাপোর্ট করে।
ছবি ও ভিডিওর মান:
ক্যামেরার ছবিগুলো বেশ প্রাণবন্ত ও ডিটেইলড আসে। তবে মেইন এবং আল্ট্রা-ওয়াইড সেন্সর দুটির কালার টোন কিছুটা অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড বা উজ্জ্বল (Vivid) করার প্রবণতা রয়েছে, যা অনেক সময় বাস্তব রঙের চেয়ে আলাদা মনে হতে পারে। ভিডিওর ক্ষেত্রে এটি সর্বোচ্চ 4K@30fps রেকর্ড করতে পারে। এতে স্যামসাংয়ের মতো একটি ‘হরাইজন লক’ (Horizon Lock) ফিচার রয়েছে, যা ফোন ৯০ ডিগ্রি ঘোরালেও ভিডিও সোজা ও স্থিতিশীল রাখে (যদিও এটি কেবল 1080p@30fps-এ সীমাবদ্ধ)।
পারফরম্যান্স ও সফটওয়্যার: ক্লিন ও ফাস্ট
প্রসেসর: ফোনটিতে ব্যবহার করা হয়েছে ৪ ন্যানোমিটারের MediaTek Dimensity 8500 Extreme চিপসেট। এটি দৈনন্দিন মাল্টিটাস্কিং এবং কল অব ডিউটির মতো ভারী গেমগুলো অনায়াসে কোনো ল্যাগ ছাড়াই চালাতে পারে। গিকবেঞ্চ ৬ (Geekbench 6) টেস্টে এটি আগের জেনারেশনের চেয়ে বেশ ভালো স্কোর দেখিয়েছে।
স্টোরেজ: এতে রয়েছে UFS 4.1 স্টোরেজ এবং ৮ জিবি বা ১২ জিবি র্যাম অপশন।
সফটওয়্যার: ফোনটি লেটেস্ট Android 16-এ রান করছে। মোটোরোলার স্টক-লাইক ক্লিন ইন্টারফেসের পাশাপাশি এতে রয়েছে ডেডিকেটেড Moto AI কি (Key), যা পারপ্লেক্সিটি (Perplexity) এবং মাইক্রোসফটের কোপাইলট (Copilot) দ্বারা চালিত। কোম্পানিটি ৩টি মেজর অ্যান্ড্রয়েড আপডেট এবং ৫ বছরের সিকিউরিটি সাপোর্টের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।
ব্যাটারি ও অডিও: আসল গেম চেঞ্জার!
দানবীয় ব্যাটারি: মাত্র ৭.১৯ মিমি বডির ভেতর মোটোরোলা কীভাবে 6500 mAh-এর সিলিকন-কার্বন ব্যাটারি প্যাক করেছে, তা সত্যিই বিস্ময়কর! ব্যাটারি লাইফের দিক থেকে এটি এককথায় চ্যাম্পিয়ন। সাধারণ ব্যবহারে অনায়াসে ২ দিন বা তারও বেশি ব্যাকআপ পাওয়া যাবে।
চার্জিং: ফোনটি ৯০ ওয়াট (90W) ফাস্ট চার্জিং এবং ১৫ ওয়াট (15W) ওয়ারলেস চার্জিং সাপোর্ট করে। মাত্র ৩০ মিনিটে এটি প্রায় ৬৪% চার্জ হতে পারে।
অডিও: ডলবি অ্যাটমস (Dolby Atmos) সমর্থিত এর ডুয়াল লাউডস্পিকারের সাউন্ড কোয়ালিটি এই প্রাইস রেঞ্জের অন্যতম সেরা। ফুল সাউন্ডেও কোনো ডিস্টরশন বা আওয়াজ ফেটে যাওয়ার সমস্যা নেই।
এক নজরে স্পেসিফিকেশন
| ফিচার | বিবরণ |
| ডিসপ্লে | 6.78-inch AMOLED, 144Hz, 2731 nits |
| প্রসেসর | MediaTek Dimensity 8500 Extreme (4nm) |
| মেমোরি | 8GB/12GB RAM | UFS 4.1 Storage (No MicroSD) |
| পেছনের ক্যামেরা | 50MP (Main, OIS) + 50MP (UW) + 50MP (Telephoto, 3.5x) |
| সামনের ক্যামেরা | 50MP |
| ব্যাটারি ও চার্জিং | 6500 mAh | 90W Wired, 15W Wireless |
| ওএস | Android 16 (3 Major Updates) |
| সুরক্ষা | IP68/IP69, MIL-STD-810H |
ভালো ও মন্দ দিক
যা ভালো লেগেছে:
স্লিম অথচ অত্যন্ত টেকসই ও ওয়াটারপ্রুফ ডিজাইন।
৬৫০০ এমএএইচ ব্যাটারির অবিশ্বাস্য ব্যাকআপ।
ডলবি অ্যাটমস লাউডস্পিকারের চমৎকার সাউন্ড।
বক্সে ৯০০ ওয়াটের দ্রুত চার্জিং সুবিধা।
যা ভালো লাগেনি:
ডিসপ্লেটি প্রয়োজনের চেয়ে বেশি কার্ভড।
ফিঙ্গারপ্রিন্ট সেন্সরের পজিশন খুব নিচে এবং কিছুটা ধীরগতির।
ক্যামেরার ছবি মাঝে মাঝে অতিরিক্ত রঙিন বা ওভার-স্যাচুরেটেড দেখায়।




















