শিশু-কিশোরদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিষিদ্ধ করার সরকারি উদ্যোগ হিতে বিপরীত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এ ধরনের কঠোর পদক্ষেপের ফলে বাজারে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর (বিগ টেক) একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ আরো শক্তিশালী হতে পারে। ফলে ছোট ও নতুন মাধ্যমগুলোর বিকাশ বাধাগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন উদীয়মান সামাজিক মাধ্যম ‘ব্লুস্কাই’-এর একজন শীর্ষ কর্মকর্তা রোজ ওয়াং। খবর সিএনবিসি।
ওয়াং আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ‘দীর্ঘমেয়াদে আমরা হয়তো এমন এক পৃথিবীতে প্রবেশ করতে যাচ্ছি, যেখানে মাত্র তিন থেকে পাঁচটি বড় সামাজিক মাধ্যম টিকে থাকবে। সেসব প্লাটফর্মে থাকবে সরকারের চরম নিয়ন্ত্রণ। বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা বা কমপ্লায়েন্স তদারকি করার দলের আকারই হবে ছোট প্রতিষ্ঠানের মোট কর্মীর চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বড়। বর্তমানে ব্লুস্কাইয়ের কর্মী সংখ্যা মাত্র ৪০ জন। এমন বাস্তবতায় ছোট ও নতুন উদ্যোক্তাদের পক্ষে বাজারে প্রবেশ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
তিনি জানান, ছোট ও ওপেন সোর্স প্লাটফর্মগুলো নিয়মনীতির বিরোধী নয়। তবে নতুন নিয়ম যেন ছোট প্রতিষ্ঠানগুলোর বিকাশের পথ বন্ধ না করে, সেটি নিশ্চিত করতে হবে। তরুণদের সুরক্ষা ও নিরাপত্তা বজায় রাখার সিদ্ধান্ত যেন বাজার থেকে ছোটদের বিদায় না করে।
বিশ্বের প্রথম দেশ হিসেবে অস্ট্রেলিয়া গত বছরের ডিসেম্বরে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের ওপর সামগ্রিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। এর আওতায় মেটার ইনস্টাগ্রাম, বাইটড্যান্সের টিকটক, অ্যালফাবেটের ইউটিউব, ইলোন মাস্কের এক্স ও রেডিটের মতো বড় প্লাটফর্মগুলোকে ব্যবহারকারীর বয়স যাচাইয়ের কঠোর নিয়ম চালু করতে হয়েছে। বয়স নির্ধারণে ফেসিয়াল এস্টিমেশন (সেলফির মাধ্যমে মুখমণ্ডল যাচাই), পরিচয়পত্র আপলোড বা ব্যাংক হিসাবের তথ্য যুক্ত করার মতো পদ্ধতি ব্যবহার করা হচ্ছে। অস্ট্রেলিয়া সরকারের বয়স যাচাইয়ের এ নিয়মগুলো যথাযথভাবে প্রতিপালন করতে ব্যর্থ হলে সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সর্বোচ্চ ৪ কোটি ৯৫ লাখ অস্ট্রেলিয়ান ডলার পর্যন্ত জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে।
অস্ট্রেলিয়ার ই-সেফটি কমিশনারের তথ্য অনুযায়ী, ব্লুস্কাইও প্লাটফর্মে ১৬ বছরের কম বয়সীদের দূরে রাখতে বয়স নিশ্চিতকরণের ব্যবস্থা যুক্ত করেছে। অস্ট্রেলিয়ার এ কঠোর আইন এখন বৈশ্বিক মডেলে পরিণত হয়েছে। যুক্তরাজ্য, স্পেন, ফ্রান্স ও অস্ট্রিয়াসহ বেশ কয়েকটি দেশ একই ধরনের আইন প্রণয়নের প্রস্তাব বিবেচনা করছে।
তবে সরকার তরুণদের সুরক্ষার কথা বললেও বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো এ পদক্ষেপের বিরোধিতা করছে। কোম্পানিগুলোর যুক্তি, এ ধরনের নিষেধাজ্ঞা কিশোর-কিশোরীদের ক্ষতিকর কনটেন্ট দেখা থেকে পুরোপুরি বিরত রাখতে পারবে না। উল্টো তরুণরা তাদের বন্ধু ও নিজস্ব কমিউনিটি থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।
২০১৯ সালে এক্সের (তৎকালীন টুইটার) ভেতরে একটি প্রকল্প হিসেবে ব্লুস্কাইয়ের জন্ম হয়। দুই বছর পর এটি একটি স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে ও ইলোন মাস্কের মালিকানাধীন এক্সের অন্যতম প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠে। চলতি বছরের মার্চ মাস নাগাদ এর ব্যবহারকারীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪ কোটি ৩০ লাখে। তবে এটি এখনো এক্সের মোট ব্যবহারকারীর (প্রায় ৪৫ কোটি) মাত্র ১০ শতাংশ।
ব্লুস্কাইয়ের সিওও রোজ ওয়াং জানান, নিয়ন্ত্রণ হতে হবে উদ্ভাবনের সহযোগী। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সঙ্গে ছোট ও মাঝারি ব্যবসা ও নতুন প্লাটফর্মগুলোর যোগাযোগের পথ সহজ করতে হবে। ছোটদের সুরক্ষার পাশাপাশি নিয়মনীতি ফাঁকি দেয়া বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। এ দুয়ের মধ্যে একটি ভারসাম্যপূর্ণ সমন্বয় জরুরি।




















