ফেসবুকের টার্মস অফ সার্ভিস (TOS) বা রিপোর্টিং সিস্টেমের ভয়াবহ অপব্যবহার করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিক, অধিকারকর্মী ও রাজনৈতিক কর্মীদের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পরিকল্পিতভাবে ডিজএবল বা নিষ্ক্রিয় করে দিচ্ছে বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
এই চক্রটি সুনির্দিষ্ট টার্গেটকে ‘আইএস’ বা ‘আল-কায়েদা’-এর মতো আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে তৈরি করা মেসেঞ্জার গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত করছে এবং পরে সেটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ হিসেবে ফেসবুকের কাছে রিপোর্ট করে অ্যাকাউন্টগুলো বন্ধ করতে সক্ষম হচ্ছে।
এই কৌশলের শিকার হওয়া একাধিক ব্যবহারকারী এবং সম্প্রতি আক্রান্ত একজন সাংবাদিকের প্রাথমিক অনুসন্ধানে এই তথ্যের সত্যতা মিলেছে।
যেভাবে পাতা হচ্ছে এই নতুন ফাঁদ ভুক্তভোগীদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যে জানা যায়, এই আক্রমণের কৌশলটি কয়েকটি ধাপে সম্পন্ন হয়:
১. বার্তা প্রেরণ: প্রথমে চক্রটির সদস্যরা টার্গেট করা অ্যাকাউন্টে (যেমন কোনো সাংবাদিক বা অ্যাক্টিভিস্ট) একটি সাধারণ বার্তা বা মেসেজ রিকোয়েস্ট পাঠায়। ২. উত্তর দেওয়ার অপেক্ষা: সাংবাদিক বা অধিকারকর্মীরা, যারা পেশাগত কারণে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য বা টিপস পেতে মেসেজ সেটিংস খোলা রাখেন, তারা সরল বিশ্বাসে সেই বার্তার উত্তর দেন। ৩. গ্রুপ চ্যাটে যুক্ত করা: টার্গেট করা ব্যক্তি বার্তার উত্তর দেওয়ার সাথে সাথেই, অথবা কিছু ক্ষেত্রে উত্তর না দিলেও, আক্রমণকারী সেই কথোপকথনে আরও কয়েকটি অ্যাকাউন্ট যোগ করে একটি গ্রুপ চ্যাট তৈরি করে। ৪. গ্রুপের নামকরণ: এই গ্রুপ চ্যাটগুলোর নাম দেওয়া হয় বিভিন্ন পরিচিত সন্ত্রাসী সংগঠনের নামে (যেমন: আইএস, আল-কায়েদা ইত্যাদি)। ৫. মিথ্যা রিপোর্ট: গ্রুপটি তৈরি করার পরই, চক্রের সদস্যরা নিজেরাই সম্পূর্ণ গ্রুপ চ্যাটটিকে ‘সন্ত্রাসবাদ’ বা ‘Terrorism’ হিসেবে ফেসবুকের কাছে মিথ্যা রিপোর্ট করে।
ফেসবুকের স্বয়ংক্রিয় মডারেশন সিস্টেম (Automated Moderation), গ্রুপের নামে সন্ত্রাসী সংগঠনের উল্লেখ এবং একাধিক রিপোর্ট পেয়ে, দ্রুত সেই গ্রুপে থাকা (টার্গেট করা) অ্যাকাউন্টটিকে কমিউনিটি স্ট্যান্ডার্ড লঙ্ঘনের দায়ে ডিজএবল বা নিষ্ক্রিয় করে দেয়।
কেন সাংবাদিকরা বেশি ঝুঁকিতে? এই কৌশলটি সাংবাদিক ও অধিকারকর্মীদের জন্য বিশেষভাবে ক্ষতিকর। কারণ, পেশাগত কারণেই তাদের সাধারণ মানুষের কাছ থেকে তথ্য বা টিপস পেতে ‘সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মেসেজ পাবার’ সেটিংসটি চালু রাখতে হয় এবং নিয়মিত স্প্যাম ফোল্ডার চেক করতে হয়। অসাধু চক্রটি ঠিক এই সুযোগটিই কাজে লাগাচ্ছে।
অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার উপায় বিশেষজ্ঞরা এই ধরনের হঠকারী আক্রমণ থেকে আপাতত অ্যাকাউন্ট নিরাপদ রাখার জন্য কিছু পরামর্শ দিচ্ছেন। এর মধ্যে রয়েছে:
- মেসেঞ্জারে ‘সব ব্যবহারকারীর কাছ থেকে মেসেজ পাবার’ (Message requests from everyone) সেটিংসটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা।
- মেসেঞ্জারের স্প্যাম (Spam) ফোল্ডারে আসা কোনো বার্তা বা সম্পূর্ণ অপরিচিত কারো পাঠানো মেসেজ যাচাই না করে ওপেন না করা বা সেগুলোর উত্তর না দেওয়া।
মেটা’কে জানানো হয়েছে জানা গেছে, ফেসবুকের রিপোর্টিং সিস্টেমের এই গুরুতর দুর্বলতা (Vulnerability) এবং এর অপব্যবহারের বিষয়টি ইতোমধ্যে ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান ‘মেটা’-এর যথাযথ টিমকে অবহিত করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের সূত্রে জানা গেছে, মেটা কর্তৃপক্ষ এই সমস্যা সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।






















