কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হলেও এক চীনা কোম্পানি তাদের পারমাণবিক বিদ্যুৎচালিত ব্যাটারির মাধ্যমে আপাত এক অসম্ভবকেই বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছে। মুদ্রার আকারের ব্যাটারিটি মানুষের প্রাত্যহিক প্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন বদলে দিতে পারে বলে দাবি এর নির্মাতার।
স্মার্টফোনের ছোট লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি থেকে শুরু করে বিদ্যুচ্চালিত গাড়ি বা ইভির বড় আকারের ব্যাটারি সবই এখন এক অর্থে মানুষের জীবন নিয়ন্ত্রণ করছে। বিভিন্ন যন্ত্রপাতির সরঞ্জাম তৈরির কোম্পানিগুলোও এখন ব্যাটারি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল।
তবে ব্যাটারির সবচেয়ে বড় অসুবিধা হচ্ছে এর সীমিত আয়ু। দীর্ঘস্থায়ী চার্জ থাকে এমন স্মার্টফোনও একবার চার্জ দেওয়ার পর বড়জোর এক বা দুই দিন চলে। ফলে আগের মতো আর চার্জ থাকে না, যা অনেকের বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
তবে চীনা কোম্পানি ‘বেটাভোল্ট’ সম্প্রতি দেখিয়েছে, ভবিষ্যতে পরিস্থিতি এমন নাও থাকতে পারে, অর্থাৎ ব্যাটারি আরও দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে ‘বেটাভোল্ট’ ঘোষণা করেছিল, তারা এমন এক পারমাণবিক ব্যাটারি তৈরি করছে, যা রিচার্জ ছাড়াই টানা ৫০ বছর চলতে পারে।
কয়েন বা মুদ্রার আকারের এ ব্যাটারিটির নাম ‘বিভি১০০’, যা শক্তি উৎস হিসেবে ‘নিকেল ৬৩’ ব্যবহার করে ৩ ভোল্টে ১০০ মাইক্রোওয়াট বিদ্যুৎ তৈরি করে।
কোম্পানিটি ২০২৫ সালে ১ ওয়াট সক্ষমতার এক শক্তিশালী সংস্করণ আনার পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তা বাজারে এসেছে কি না তা এখনও স্পষ্ট নয়। তবে ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৫ সালে গণহারে এর উৎপাদন শুরু করেছে কোম্পানিটি।
পারমাণবিক ব্যাটারি কীভাবে কাজ করে?
বেটাভোল্ট-এর নতুর ব্যাটারিটির বিষয়টি সত্যিই রোমাঞ্চকর হলেও তা বিজ্ঞানীদের তৈরি করা প্রথম তেজস্ক্রিয় ব্যাটারি নয়।
২০২৪ সালের শেষদিকে ‘ইউনিভার্সিটি অফ ব্রিস্টল’-এর গবেষকরা প্রথমবারের মতো ‘কার্বন-১৪ ডায়মন্ড ব্যাটারি’ তৈরি করেছিলেন, যার আনুমানিক আয়ুষ্কাল হাজার বছর।
তবে সেই ব্যাটারিটিও এই দৌড়ে বেশ দেরিতেই এসেছিল। কারণ ১৯৫৪ সালের দিকেই পারমাণবিক ব্যাটারি তৈরি করেছিল ‘আরসিএ’।
একইভাবে আরেকটি ‘রেডিওআইসোটোপ থার্মোইলেকট্রিক জেনারেটর’ বা আরটিজি, যা রেডিওআইসোটোপ পাওয়ার সিস্টেম নামেও পরিচিত বা পারমাণবিক ব্যাটারি ১৯৬১ সালে মার্কিন নৌবাহিনীর ‘ট্রানজিট ৪এ’ ও ‘৪বি’ স্যাটেলাইটে শক্তি জুগিয়েছিল।
পারমাণবিক ব্যাটারির মূল ধারণাটি বেশ সহজ। এগুলো তেজস্ক্রিয় মৌলের ক্ষয় হওয়া থেকে শক্তি গ্রহণ করে, যা কয়েক দশক ধরে চলতে পারে এবং সেই শক্তিকে বিদ্যুতে রূপান্তরিত করে।
আরটিজি এ কাজটি করত ‘সিবেক ইফেক্ট’-এর মাধ্যমে। এ পদ্ধতিতে উপযোগী এক পরিবাহীর মধ্যে তাপমাত্রার পার্থক্যের (যা তেজস্ক্রিয় ক্ষয়ের তাপ থেকে তৈরি হয়) সাহায্যে ভোল্টেজ বা বিদ্যুৎ তৈরি হয়।
বেটাভোল্টের ‘বিভি১০০’ও একই ধরনের মৌলিক নীতিতে কাজ করে, তবে তা তাপের বদলে ‘বিটা বিকিরণ’ ব্যবহার করে। ‘বিভি১০০’-এর ভেতরে থাকা তেজস্ক্রিয় ‘নিকেল-৬৩’ কোর থেকে নির্গত বিভিন্ন বিটা কণা হীরা দিয়ে তৈরি সেমিকন্ডাক্টর শুষে নেয়।
এরপর সেই তেজস্ক্রিয় ক্ষয় থেকে তৈরি ইলেকট্রনগুলোকে সরাসরি বিদ্যুতে রূপান্তরিত হয়। ফলে তৈরি হয় একটি অতি ক্ষুদ্র ব্যাটারি, যা কোনো প্রাণীর ক্ষতি না করেই টানা ৫০ বছর চলতে পারে।
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বেটাভোল্ট বলেছিল, তাদের এ ব্যাটারি স্মার্টফোন চার্জ দেওয়ার ঝামেলা পুরোপুরি দূর করতে এবং বিভিন্ন ড্রোনকে প্রায় অনির্দিষ্টকাল আকাশে উড়তে সাহায্য করতে পারে।
তবে বিষয়টি শুনতে রোমাঞ্চকর মনে হলেও অনেক বিশেষজ্ঞ বা পর্যবেক্ষকরাই এ নিয়ে খুব একটা আশাবাদী নন।



















