রোবোটিক্স, অ্যারোস্পেস এবং বিলিয়ন ডলারের গ্রিন ফ্রন্টিয়ার’ শিরোনামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অডিটোরিয়ামে ১ এপ্রিল, বুধবার অনুষ্ঠিত হলো বিশেষ কারিগরি সেমিনার। বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ আয়োজিত এই সেমিনারের মূল লক্ষ্য ছিল ভবিষ্যৎ ইঞ্জিনিয়ারদের বৈশ্বিক ক্যারিয়ার ও উদ্ভাবনী প্রযুক্তিতে সম্পৃক্ত হওয়ার সাহস ও সঠিক দিকনির্দেশনা প্রদান করা।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ (Keynote) উপস্থাপন করেন এয়ারবাস (Airbus) জার্মানির কস্টিং ডাটা ও টুলস প্রধান আসাদ কাগজী। নিজের জীবন সংগ্রামের গল্প শুনিয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের আশ্বস্ত করেন, বাংলাদেশের শিকড় থেকেই বিশ্বমানের ক্যারিয়ার গড়া সম্ভব।
তিনি বলেন, “এয়ারবাস আজ শক্তিশালী, কিন্তু তোমাদের ইউনিক আইডিয়া ও সক্ষমতার মাধ্যমে আমরা আরও শক্তিশালী হতে চাই”। তিনি ২০৩৫ সালের মধ্যে মহাকাশ অর্থনীতির আকার ১.৮ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে শিক্ষার্থীদের এই বিশাল বাজারে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। বললেন, ২০৩০ সালের মধ্যে মেকাট্রনিক্সের বিশ্ববাজার প্রায় ৩১৭.২ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছাবে।
এয়ারবাসের বাংলাদেশি এই শুভেচ্ছা দূত মেকাট্রনিক্স ইকোসিস্টেমকে একটি “ন্যাশনাল মাল্টিপ্লায়ার” হিসেবে অভিহিত করে বলেন, এআই, সিভিল, ইলেকট্রিক্যাল এবং অ্যারোস্পেস ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমন্বয়ে একটি স্বনির্ভর জাতীয় অর্থনীতি গড়ে তুলতে সক্ষম।মহাকাশ জয়ের স্বপ্নের পাশাপাশি তিনি দেশের বিদ্যমান সংকটের দিকেও আলোকপাত করেন। তিনি জানান, বাংলাদেশে পরিবেশগত অবক্ষয়ের কারণে জাতীয় জিডিপির প্রায় ১৭.৬% ক্ষতি হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ২০৫০ সালের মধ্যে কৃষি জিডিপির এক-তৃতীয়াংশ ধ্বংস হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে। এই সংকট সমাধানে মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়াররা অটোমেটেড বর্জ্য বাছাই মেশিন, স্মার্ট ভেহিকেল এমিশন সেন্সর এবং আইওটি চালিত ড্রোন তৈরি করে সরাসরি ভূমিকা রাখতে পারেন।
শিক্ষার্থীদের জন্য বর্তমানের বড় বড় প্রজেক্টের সুযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র মতো সংস্থাগুলো বাংলাদেশে বড় অংকের বিনিয়োগ করছে। এর মধ্যে নদী পর্যবেক্ষণের জন্য ৪১০ মিলিয়ন ডলারের DWATER প্রজেক্ট এবং আরএমজি খাতে রোবোটিক্স ব্যবহারের জন্য ২৫৬.৫ মিলিয়ন ডলারের গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড উল্লেখযোগ্য। এছাড়া ইউএনডিপি’র মাধ্যমে তরুণদের হার্ডওয়্যার প্রোটোটাইপ তৈরির জন্য সিড ফান্ডিং বা অনুদান প্রদান করা হচ্ছে।
সেমিনারে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দেশের উদীয়মান অ্যারোস্পেস স্টার্টআপ ‘ধূমকেতু এক্স’-এর প্রধান নাহিয়ান আর রহমান। বাংলাদেশ সক্ষমতা নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করে তিনি বলেন, “রকেট লঞ্চিংয়ের ক্ষেত্রে আগামীতে একটি বিশাল রপ্তানি বাজার তৈরি হচ্ছে। আমরা দেশীয় মেধা কাজে লাগিয়ে এই আন্তর্জাতিক বাজারটি ধরার লক্ষ্য নিয়ে কাজ করছি। নীতিমালার ঘাটতি ও অর্থায়ন সহযোগিতার কোন সুযোগ না থাকায় নিজস্ব তহবিল থেকে কাজ করছি।”
সভাপতির বক্তব্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোবোটিক্স অ্যান্ড মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. সৌগত আহমেদ দেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ও উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “আমাদের রিসাইজ সিস্টেমে রকেট প্রযুক্তি এবং এয়ারপ্লেনে জেট প্রোপালশন ব্যবহৃত হয়। দেশে যদি রকেট তৈরির মতো প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠতে পারে, তবে কেন আমরা নিজস্ব প্রযুক্তি (ICDM) তৈরি করে প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করব না?”
তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, বর্তমানে এ ধরণের প্রযুক্তি পরীক্ষার ক্ষেত্রে কিছু নীতিগত সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তবে উপস্থিত শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দিয়ে তিনি বলেন, “আগামী ১০ বছর পর আজকের এই শিক্ষার্থীরাই দেশের নীতি-নির্ধারক হবে। তাই আজ থেকে স্বপ্ন দেখা শুরু করলে ভবিষ্যতে আমরাও ইরানের মতো ‘মিসাইল সিটি’ গড়ে তুলতে সক্ষম হব।”
সেমিনারে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীবৃন্দ ছাড়াও উপস্থিত ছিলেন সিভিল এভিয়েশন এবং আইসিটি খাতের অভিজ্ঞ ব্যক্তিরা। বক্তারা একমত পোষণ করেন যে, জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশগত অবক্ষয় মোকাবিলায় মেকাট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারদের উদ্ভাবন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সেমিনারটি শেষ হয় আসাদ কাগজীর একটি বিশেষ বার্তার মাধ্যমে— শিক্ষার্থীদের কেবল প্রযুক্তি নয়, বরং সততা ও মানবতা নিয়ে চিন্তা করার আহ্বান জানান তিনি। শিক্ষার্থীদের তৈরি মেকাট্রনিক সিস্টেম দেশের ভবিষ্যৎ সুরক্ষা নিশ্চিত করতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার ভিত্তি কেবল গণিত নয়, বরং এটি সততা ও দায়বদ্ধতার নৈতিক কাঠামোর ওপর নির্মিত হওয়া উচিত। তিনি শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে বলেন, “আপনার শিক্ষা তখনই সার্থকতা পায় যখন এটি ক্লাসরুমের বাইরে গিয়ে জাতীয় টেকসই উন্নয়নে ভূমিকা রাখে”।



















