বিশ্বব্যাপী কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (AI) অভাবনীয় প্রসারের কারণে সেমিকন্ডাক্টর বা চিপের বাজারে এক নজিরবিহীন সংকট তৈরি হয়েছে। বড় চিপ নির্মাতারা এখন সাধারণ কম্পিউটারের চেয়ে এআই ডেটা সেন্টারের জন্য প্রয়োজনীয় হাই-ব্যান্ডউইথ মেমোরি উৎপাদনে বেশি মনোযোগী। এর ফলে বাংলাদেশের ১২০০ কোটি টাকার ডিজিটাল স্টোরেজ বাজারে চরম অস্থিরতা দেখা দিয়েছে, যা অচিরেই দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো প্রকল্পগুলোকে বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে।
৪০০ শতাংশের ‘প্রাইস শক’
বাজার বিশ্লেষণে দেখা গেছে, গত ৬ মাসে এসএসডি ও র্যামের দাম আকাশচুম্বী হয়েছে:
ন্যান্ড (NAND) ফ্ল্যাশ: গত ৬ মাসে এর মূল্য সূচক ৫.৭ থেকে ২৯-এ দাঁড়িয়েছে, যা ৪০০ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি।
ডিডিআর-৫ (DDR5) র্যাম: এই মেমোরির মূল্য সূচক ২৭০ শতাংশ বেড়ে ১৮০ থেকে ৫০০-এ উঠেছে।
বাস্তব চিত্র: ২০২৫ সালের শেষে যে ১৬জিবি ডিডিআর-৫ র্যামের দাম ছিল ৭,৮০০ টাকা, ২০২৬-এর শুরুতে তা ২৮,৫০০ টাকা ছাড়িয়েছে।
বাজারে হাহাকার ও খুচরা বিক্রিতে ধস
চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান স্যামসাং, এসকে হাইনিক্স ও মাইক্রন এখন এআই কম্পোনেন্ট তৈরিতে ব্যস্ত থাকায় সাধারণ ডিডিআর-৪ বা ডিডিআর-৫ র্যামের উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। ফলে ঢাকার মাল্টিপ্ল্যান বা আইডিবি ভবনের মতো বড় মার্কেটগুলোতে ল্যাপটপ ও ডেস্কটপ বিক্রি প্রায় ৭০ শতাংশ কমে গেছে। বাজেট-ফ্রেন্ডলি র্যাম বা এসএসডি এখন বাজারে দুষ্প্রাপ্য।
ঝুঁকিতে সরকারি মেগা প্রজেক্ট
এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে স্মার্ট বাংলাদেশ ও ই-গভর্নেন্সের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পগুলোতে।
১. বাজেট সংকট: তিন-চার বছর আগের ডিপিপি (DPP) দিয়ে এখন আর পণ্য কেনা সম্ভব হচ্ছে না।
২. টেন্ডার বাতিল: বাজারের দাম সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অনেক বেশি হওয়ায় দরপত্রগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে।
৩. আইনি জটিলতা: ভূমি মন্ত্রণালয়ের মতো বড় প্রকল্পে কাজ করা কোম্পানিগুলো সময়মতো মালামাল সরবরাহ করতে না পেরে ব্যাংক গ্যারান্টি লিকুইডেশনের মতো আইনি জটিলতায় পড়ছে।
বিশ্লেষকদের শঙ্কা: ২০২৮ পর্যন্ত চলবে সংকট
গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইডিসি (IDC) ও ট্রেন্ডফোর্স-এর মতে, এআই ডেটা সেন্টারের চাহিদা মেটাতে গিয়ে সাধারণ মেমোরির এই ঘাটতি অন্তত ২০২৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ডলারের বিপরীতে টাকার অবমূল্যায়ন (১১৮-১২০ টাকা) এবং আমদানিতে ভ্যাট ও শুল্কের চাপ এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
সমাধানের পথ কী?
আইটি বিশ্লেষকদের মতে, প্রচলিত ধীরগতির ক্রয় প্রক্রিয়া (Procurement Process) এখন বড় বাধা। পরিস্থিতি মোকাবিলায় কিছু জরুরি পদক্ষেপ প্রয়োজন:
দ্রুত সিদ্ধান্ত: ‘অপেক্ষা ও পর্যবেক্ষণ’ নীতি বাদ দিয়ে দ্রুত কেনাকাটা সম্পন্ন করা। কারণ ভবিষ্যতে দাম আরও বাড়বে।
দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি: সরাসরি নির্মাতাদের সাথে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির মাধ্যমে সরবরাহ নিশ্চিত করা।
বাজেট সমন্বয়: বর্তমান বাজারদরের সাথে মিল রেখে সরকারি প্রকল্পের বাজেট দ্রুত রিভাইজ বা সমন্বয় করা।
ডিজিটাল বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা ধরে রাখতে হলে এই ‘পারফেক্ট স্টর্ম’ মোকাবিলায় সরকারকে প্রথাগত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমিয়ে দ্রুত এবং সাহসী সিদ্ধান্ত নিতে হবে। আইটি হার্ডওয়্যার এখন কেবল পণ্য নয়, এটি জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ।



















