বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে দেশব্যাপী মোবাইল অপারেটরদের ‘মস্তিস্ক’ ডাটা সেন্টার বন্ধ হয়ে টেলিকম নেটওয়ার্ক বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। টেলিকম নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে জরুরি সেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল প্রশাসন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে এবং একটি জাতীয় সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
দেশের মোবাইল অপারেটরদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব মোবাইল টেলিকম অপারেটরস অব বাংলাদেশ (এমটব) জানিয়েছে, দেশব্যাপী তাদের বিভিন্ন অপারেটরের ২৭টি ডাটা সেন্টার রয়েছে। ডাটা সেন্টারই মোবাইল অপারেটরের ‘মস্তিষ্ক’— এটা বন্ধ মানে সমগ্র নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
এমটব বিটিআরসিকে এক চিঠিতে আশঙ্কার কথা জানিয়ে বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এবং সকল মোবাইল অপারেটরদের নিয়ে জরুরি উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় সভা আহ্বানের দাবি জানিয়েছে।
পাশাপাশি প্রধান ডেটা সেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা; মোবাইল বেস স্টেশনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ; প্রয়োজনে ডিপো থেকে সরাসরি জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করাতে বলেছে।
এমটব মহাসচিব লে কর্নেল (অব.) মোহাম্মদ জুলফিকার বাংলানিউজকে বলেন, বিদ্যুৎ বা জ্বালানি সরবরাহের কারণে মোবাইল অপারেটরদের ডাটা সেন্টার বন্ধ বা বাধাগ্রস্ত হলে এর প্রভাব খুব দ্রুত এবং ব্যাপকভাবে পুরো নেটওয়ার্কে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নেটওয়ার্ক সম্পূর্ণ বা আংশিক বন্ধ হলে কল, ইন্টারনেট, এসএমএসসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ হয়ে যেতে পারে বা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে।
ইন্টারনেট ডাউন বা খুব স্লো হয়ে যেতে পারে কারণ ডাটা সেন্টার থেকেই ট্রাফিক রাউটিং ও কন্ট্রোল হয়। ওটিপি, ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ই-কমার্স সেবা ইত্যাদি অর্থাৎ যে সমস্ত সেবা মোবাইল নেটওয়ার্কের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় সেসব ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। অপারেটরদের ব্যাকআপ থাকে কিন্তু যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে তাতে কতোটুকু ব্যাকআপ দেওয়া সম্ভব হবে তা নিয়েও সন্দেহ আছে। আমাদের মনে রাখতে হবে ডাটা সেন্টারই অপারেটরের ‘মস্তিষ্ক’—এটা বন্ধ মানে সমগ্র নেটওয়ার্ক বন্ধ হয়ে যাওয়া।
চিঠিতে বলা হয়, বাস্তব পরিস্থিতি অত্যন্ত সংকটাপন্ন। দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকা এবং ব্যাকআপ ব্যবস্থার জন্য নিশ্চিত জ্বালানি সরবরাহের অভাবে মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটররা চরম অপারেশনাল সংকটে পড়েছে। সাম্প্রতিক ঝড় বৃষ্টির কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়েছে, যার ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বারবার এবং দীর্ঘ সময়ের জন্য বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্নতা দেখা দিচ্ছে।
গত কয়েক দিনে গ্রিড বিদ্যুৎ বন্ধ থাকার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, ফলে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা অত্যধিক বৃদ্ধি পেয়েছে।
সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিটিএস সাইট (টাওয়ার) পরিচালনার জন্য দৈনিক ডিজেল ও অকটেন ব্যবহারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, গ্রামীনফোনের দৈনিক ২৮ হাজার ৭৯ লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার ২৫৪ লিটার অকটেন, রবি ১৩ হাজার ১৪০ লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৫১০ লিটার অকটেন, বাংলালিংক ১১ হাজার ২০৬ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৯৯৫ লিটার অকটেন ব্যবহার করে। তিন অপারেটরের দৈনিক মোট ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ ৫২ হাজার ৪২৪ লিটার ও অকটেন ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার।
সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ভিত্তিতে বিটিএস সাইট (টাওয়ার) পরিচালনার জন্য দৈনিক ডিজেল ও অকটেন ব্যবহারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, গ্রামীনফোনের দৈনিক ২৮ হাজার ৭৯ লিটার ডিজেল ও ৯ হাজার ২৫৪ লিটার অকটেন, রবি ১৩ হাজার ১৪০ লিটার ডিজেল ও ৫ হাজার ৫১০ লিটার অকটেন, বাংলালিংক ১১ হাজার ২০৬ লিটার ডিজেল ও ৪ হাজার ৯৯৫ লিটার অকটেন ব্যবহার করে। তিন অপারেটরের দৈনিক মোট ডিজেল ব্যবহারের পরিমাণ ৫২ হাজার ৪২৪ লিটার ও অকটেন ১৯ হাজার ৮৫৯ লিটার।
চিঠিতে উদ্বেগের কথা জানিয়ে বলা হয়, বর্তমানে পরিস্থিতি অপারেটরদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। এই অবস্থা অব্যাহত থাকলে দেশের বৃহৎ অংশে টেলিকম নেটওয়ার্ক ব্যাপকভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে জরুরি সেবা, দুর্যোগ মোকাবিলা, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা, আর্থিক লেনদেন, ডিজিটাল প্রশাসন এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে এবং একটি জাতীয় সংকট সৃষ্টি হতে পারে।
এই সংকটের দুটি প্রধান দিক রয়েছে। প্রথমত দীর্ঘমেয়াদি ও পুনরাবৃত্ত বিদ্যুৎবিভ্রাট ঘটে। ঝড়ের সময় অনেক অঞ্চলে প্রতিদিন ৫–৮ ঘণ্টা পর্যন্ত বিদ্যুৎ থাকে না এবং বিদ্যুৎ পুনঃস্থাপন অত্যন্ত বিলম্বিত হয়। ফলে ডেটা সেন্টার, সুইচিং সুবিধা এবং ট্রান্সমিশন হাবসহ গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম অবকাঠামো প্রায়ই গ্রিড বিদ্যুৎ ছাড়াই পরিচালিত হচ্ছে, যা নেটওয়ার্ক স্থিতিশীলতার জন্য গুরুতর ঝুঁকি তৈরি করছে।
দ্বিতীয়ত, তীব্র জ্বালানি সরবরাহ সংকট। দীর্ঘ বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে সম্পূর্ণ রূপে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। বিটিএস সাইটের পাশাপাশি ডেটা সেন্টারগুলোও জেনারেটরে চলছে। একটি ডেটা সেন্টার প্রতি ঘণ্টায় প্রায় ৫০০–৬০০ লিটার ডিজেল ব্যবহার করে, যা প্রতিদিন প্রায় ৪ হাজার লিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। স্থানীয় পেট্রোলপাম্পগুলো এ পরিমাণ জ্বালানি সরবরাহ করতে পারছে না।
বিটিআরসিতে পাঠানো চিঠিতে সাম্প্রতিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতির ভিত্তিতে ডেটাসেন্টার/সুইচিংসেন্টার পরিচালনার জন্য দৈনিক ডিজেল ব্যবহারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ তুলে ধরা হয়। সেখানে দেখা যায়, গ্রামীণফোন ১১ হাজার ১৮৪ লিটার, রবি ৭ হাজার ৮১২ লিটার এবং বাংলালিংক ৮ হাজার ২০০ লিটারসহ মোট ২৭ হাজার ১৯৬ লিটার ডিজেল দৈনিক ব্যবহার করে থাকে।
এছাড়া আন্তঃজেলা জ্বালানি পরিবহনের সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাধার কারণে পরিস্থিতি আরও খারাপ হচ্ছে। এতে গুরুত্বপূর্ণ টেলিকম স্থাপনাগুলোর জ্বালানি মজুদ বিপজ্জনকভাবে কমে গেছে।
চিঠিতে পরিস্থিতি বিবেচনায় এমটব জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণের জন্য তাৎক্ষণিক হস্তক্ষেপ কামনা করা হয়-
১. বিদ্যুৎ বিভাগ, জ্বালানি বিভাগ, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন, আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনী এবং সকল মোবাইল অপারেটরদেরকে নিয়ে জরুরি উচ্চ পর্যায়ের সমন্বয় সভা আহ্বান করা।
২. সংযুক্ত তালিকাভুক্ত প্রধান ডেটাসেন্টার ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা।
৩. সংকটকালীন সারাদেশের সকল মোবাইল বেসস্টেশনকে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহের আওতায় আনা। প্রয়োজনে ডিপো থেকে সরাসরি জরুরিভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহের ব্যবস্থা করা।
৪. জরুরি টেলিকম কার্যক্রমের জন্য জ্বালানি পরিবহন নির্বিঘ্ন রাখতে আইন-শৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীকে অবিলম্বে লিখিত নির্দেশনা প্রদান করা।
চিঠিতে সারাদেশে সকল মোবাইল অপারেটরদের জন্য সুষ্ঠুভাবে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে একটি ডাটাবেস উল্লেখ করা হয়েছে। যেখানে জ্বালানি স্টেশনের তালিকা, অপারেটরদের জোনাল প্রধানদের যোগাযোগ তথ্য এবং অনুমোদিত সরবরাহকারী কর্মীদের বিস্তারিত (নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র নম্বর, ছবিইত্যাদি) অন্তর্ভুক্ত করা হয়।



















