উষ্ণ ও আর্দ্র জলবায়ু এ সমস্যাকে আরো জটিল করে তোলে। ফলে কৃষকের পরিশ্রম ও বিনিয়োগের একটি বড় অংশই এ ক্ষতির মুখে পড়ে। এমন বাস্তবতায় বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) একদল গবেষক উদ্ভাবন করেছেন ‘গ্রেইন গার্ড’ নামের আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তি, যা কৃষি খাতে খুলে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার দুয়ার। গবেষকরা মনে করেন, পোকামাকড় দমনে কার্যকর এবং সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব এ প্রযুক্তি কৃষকের ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নিশ্চিত করবে খাদ্যনিরাপত্তা।
দেশে মোট উৎপাদিত ধানের প্রায় ৭ থেকে ১২ শতাংশ পর্যন্ত ক্ষতি হয় সংরক্ষণকালে। এ ক্ষতির প্রধান কারণ ‘রাইস উইভিল’সহ বিভিন্ন ক্ষতিকর পোকামাকড়। আর এসব পোকামাকড়ের আক্রমণ ঠেকাতে কৃষকরা সাধারণত রাসায়নিক কীটনাশক ব্যবহার করেন, যা একদিকে ব্যয় বাড়ায়, অন্যদিকে শস্যের গুণগত মান নষ্ট করে। সেই সঙ্গে বীজের অঙ্কুরোদগম ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। একই সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও এটি বড় ধরনের হুমকি তৈরি করে।
বাকৃবির ভেটেরিনারি অনুষদের অ্যানাটমি অ্যান্ড হিস্টোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়ালের নেতৃত্বে একদল গবেষক এর বিকল্প ও পরিবেশবান্ধব সমাধান খুঁজতে শুরু করেন। প্রায় পাঁচ বছর আগে শুরু করা এ গবেষণা প্রকল্পটি পরবর্তী সময়ে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা ও উদ্ভাবন কেন্দ্রের অধীনে বাস্তবায়িত হয়। সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. এহসানুল কবিরসহ একটি দক্ষ দল দীর্ঘ গবেষণা, নকশা উন্নয়ন, পরীক্ষামূলক বিশ্লেষণ এবং মাঠপর্যায়ের যাচাই-বাছাই শেষে ‘গ্রেইন গার্ড’ ডিভাইসটি তৈরি করেন।
গবেষকরা জানান, ‘গ্রেইন গার্ড’ একটি আধুনিক আল্ট্রাসনিক প্রযুক্তিনির্ভর যন্ত্র, যা উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির শব্দতরঙ্গ উৎপন্ন করে। এ শব্দ মানুষের কানে শোনা যায় না, তবে শস্যের ক্ষতিকর পোকামাকড়ের ওপর তা মারাত্মক প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে ‘রাইস উইভিল’-এর স্নায়ুতন্ত্রে এ তরঙ্গ বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। ফলে পোকাগুলোর চলাচল, খাদ্য গ্রহণ এবং প্রজনন প্রক্রিয়া ব্যাহত হয়। ধীরে ধীরে তারা দুর্বল হয়ে পড়ে এবং শস্য থেকে সরে যায়। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো এ পুরো প্রক্রিয়ায় কোনো ধরনের রাসায়নিক ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না।
প্রকল্পের প্রধান গবেষক অধ্যাপক ড. মো. আব্দুল আওয়াল বলেন, ‘দেশে মোট ধান উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশ ক্ষতি রোধ করা সম্ভব হলে বছরে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা সাশ্রয় করা যাবে। পাশাপাশি বীজের অঙ্কুরোদগম হার যদি অন্তত ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পায়, তবে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টন বীজ সাশ্রয় হবে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। তাছাড়া এ প্রযুক্তি শুধু কৃষকের ব্যয়ই কমাবে না, বরং দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
প্রযুক্তিটি ব্যাপকভাবে মাঠপর্যায়ে ছড়িয়ে দেয়া গেলে দেশের কৃষি খাতে এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসতে পারে। কৃষকরা কম খরচে শস্য সংরক্ষণ করতে পারবেন এবং উৎপাদনের গুণগত মানও বাড়বে বলে জানান গবেষক ড. মো. আব্দুল আওয়াল।



















