প্রয়োজনীয় চাহিদা মেটাতে টেক জায়ান্টগুলো বিপুলসংখ্যক ডেটা সেন্টার নির্মাণ করছে। এসব কেন্দ্র সচল রাখতে প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। বিদ্যুতের চাহিদা মেটাতে বর্তমানে মাইক্রোসফট ও মেটার মতো বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। আন্তর্জাতিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে বলে জানিয়েছে টেকক্রাঞ্চ।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রে গত দুই বছরে একটি প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের খরচ প্রায় ৬৬ শতাংশ বেড়েছে।
নির্মাণ ব্যয়ের অস্বাভাবিক উল্লম্ফন
প্রতিবেদনের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালেও এক কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতার একটি কম্বাইন্ড সাইকেল গ্যাস টারবাইন (সিসিজিটি) বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ করতে খরচ হতো ১ হাজার ৫০০ ডলারের কম। কিন্তু এক বছরের ব্যবধানে সে খরচ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ১৫৭ ডলারে। যুক্তরাষ্ট্রে বর্তমানে প্রাকৃতিক গ্যাসের দাম তুলনামূলক কম থাকলেও অবকাঠামো নির্মাণের এ চড়া মূল্য বিনিয়োগকারীদের ভাবিয়ে তুলছে।
খরচের পাশাপাশি সময়ক্ষেপণও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এখন একটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ সম্পন্ন করতে আগের চেয়ে প্রায় ২৩ শতাংশ বেশি সময় লাগছে।
কেন বাড়ছে এ চাহিদা?
মূলত ডেটা সেন্টারের সংখ্যা বৃদ্ধিই বিদ্যুতের চাহিদাকে আকাশচুম্বী করে তুলেছে। শুধু প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোই নয়, সাধারণ বিদ্যুৎ সরবরাহকারী ইউটিলিটি প্রতিষ্ঠানগুলোও এখন প্রাকৃতিক গ্যাসের দিকে ঝুঁকছে। মার্কিন প্রশাসনের পক্ষ থেকে ডেটা সেন্টার পরিচালনাকারীদের নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যবস্থার পরামর্শ দেয়া হয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে এ বর্ধিত খরচ সাধারণ গ্রাহকদের ওপর চাপিয়ে দেয়ার প্রবণতা দেখা যায়। ফলে সাধারণ জনগণের মধ্যে ডেটা সেন্টারের প্রতি একধরনের নেতিবাচক ধারণা বা ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ডেটা সেন্টারগুলো বর্তমানে বিদ্যুৎ ব্যবহারের দিক থেকে দ্রুততম বর্ধনশীল খাতগুলোর একটি। এখন খাতটির বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ৪০ গিগাওয়াট। ধারণা করা হচ্ছে, ২০৩৫ সাল নাগাদ এ চাহিদা ২ দশমিক ৭ গুণ বেড়ে ১০৬ গিগাওয়াটে পৌঁছবে। ডেটা সেন্টারের বিশাল চাহিদার পেছনে রয়েছে এগুলোর ক্রমবর্ধমান আয়তন। বর্তমানে মাত্র ১০ শতাংশ ডেটা সেন্টার ৫০ মেগাওয়াট বা তার বেশি সক্ষমতাসম্পন্ন। কিন্তু আগামী দশকে একেকটি গড় ডেটা সেন্টারের আকার হবে ১০০ মেগাওয়াটেরও বেশি।
টারবাইন সংকট ও বাজার পরিস্থিতি
প্রাকৃতিক গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ কেন্দ্রের অন্যতম প্রধান অংশ হলো গ্যাস টারবাইন। বর্তমানে বিশ্ববাজারে টারবাইনের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে। একটি নতুন বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণের মোট খরচের প্রায় ৩০ শতাংশই ব্যয় হয় এ যন্ত্রের পেছনে। ২০১৯ সালের তুলনায় যন্ত্রাংশটির দাম চলতি বছরের শেষ নাগাদ ১৯৫ শতাংশ বাড়তে পারে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা বলেন, টারবাইন তৈরির বিশেষায়িত কারিগরি পদ্ধতির কারণে এর উৎপাদন হুট করে বাড়ানো সম্ভব নয়। ফলে যারা আজ নতুন টারবাইন অর্ডার করছে, তাদের ২০৩০ সালের শুরু পর্যন্ত দীর্ঘ অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে।
পরিবেশগত বিপর্যয় ও কার্বন নিঃসরণ
প্রাকৃতিক গ্যাসের ব্যবহার শুধু আর্থিক নয়, পরিবেশের জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ‘ওয়্যার্ড’ ম্যাগাজিনের এক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের ১১টি গ্যাসচালিত ডেটা সেন্টার যে পরিমাণ গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ করে, তা বিশ্বের অনেক দেশের মোট নিঃসরণের চেয়েও বেশি। কেন্দ্রগুলো বছরে প্রায় ১২ কোটি ৯০ লাখ টন কার্বন নিঃসরণ করতে পারে, যা মরক্কোর মতো দেশের মোট কার্বন ফুটপ্রিন্টের তুলনায় বেশি। উদাহরণ হিসেবে টেনেসিতে ইলোন মাস্কের নতুন মেগা ডেটা সেন্টার ক্যাম্পাসের কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে, যার একক নিঃসরণ আইসল্যান্ডের মতো দেশের সমান। এ প্রবণতা বিশ্বকে আবারো জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর দীর্ঘমেয়াদে নির্ভরশীল করে তুলছে, যা জলবায়ু লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে বড় বাধা বলে মনে করছেন পরিবেশবিদরা।


















