ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটসহ জাল নথিপত্র ব্যবহার করে বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদন নিয়ে কয়েক বছর ধরে সমালোচনা হচ্ছে।
বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, কানাডাসহ ইউরোপের দেশগুলো এ বিষয়ে বিভিন্নভাবে নিজেদের ক্ষোভ প্রকাশ করে আসছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটে কিউআর কোড সংযুক্ত করার নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। ভ্রমণ, উচ্চশিক্ষা কিংবা কর্মসংস্থানের উদ্দেশে বিদেশযাত্রার ক্ষেত্রে এ নির্দেশনা কার্যকর হবে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি বিভাগ-১ থেকে গতকাল এ-সংক্রান্ত প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। দেশের সবক’টি তফসিলি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহীর কাছে পাঠানো প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, বিভিন্ন দূতাবাস ও ভিসা সেন্টারে বাংলাদেশী নাগরিকদের ভিসা আবেদনের সময় ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট ও অন্য আর্থিক নথি জমা দিতে হয়। তবে এসব নথি তাৎক্ষণিকভাবে যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় দূতাবাস ও ভিসা সেন্টারগুলো নানা জটিলতার মুখোমুখি হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে ভিসা আবেদন নিষ্পত্তির সময় ও প্রশাসনিক ব্যয় কমানোর পাশাপাশি নথির সত্যতা দ্রুত যাচাই নিশ্চিত করতে ডিজিটাল ভেরিফিকেশন ব্যবস্থা চালুর প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ভিসা আবেদনের জন্য ইস্যু করা ব্যাংক স্টেটমেন্ট, সলভেন্সি সার্টিফিকেট, ইনভেস্টমেন্ট সার্টিফিকেটসহ সংশ্লিষ্ট নথিতে অনলাইন যাচাইযোগ্য কিউআর কোড থাকতে হবে। ওই কোড স্ক্যান করে ন্যূনতম পাঁচটি তথ্য যাচাই করা যাবে। এগুলো হলো অ্যাকাউন্ট নম্বর, হিসাবধারীর নাম, স্টেটমেন্ট শুরুর স্থিতি (ওপেনিং ব্যালান্স), স্টেটমেন্টের শেষ স্থিতি (ক্লোজিং ব্যালান্স) এবং স্টেটমেন্ট তৈরির তারিখ। এসব তথ্য কমপক্ষে ছয় মাস সংরক্ষণ ও যাচাইযোগ্য রাখার নির্দেশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রজ্ঞাপনের নির্দেশনা কার্যকরে ব্যাংকগুলোকে আগামী ৯০ দিনের মধ্যে প্রয়োজনীয় প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা চালুর নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এ ব্যবস্থা চালুর ক্ষেত্রে সাইবার নিরাপত্তা ও তথ্য সুরক্ষা-সংক্রান্ত বিদ্যমান বিধিবিধান কঠোরভাবে অনুসরণ করতে হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, কয়েক বছর ধরেই ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশীদের ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে ভুয়া নথিপত্র জমা দেয়ার অভিযোগ করে আসছে। এর মধ্যে গত ৭ মে গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। ওই সময় সারাহ কুকের পক্ষ থেকে ভিসা আবেদনের সঙ্গে ভুয়া ব্যাংক স্টেটমেন্ট জমা দেয়াসহ জাল নথিপত্রের বেশকিছু ঘটনা তুলে ধরা হয়। তাই এসব প্রতারণা প্রতিরোধে বাংলাদেশ ব্যাংকের হস্তক্ষেপ কামনা করেন ব্রিটিশ দূত। এক্ষেত্রে ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ নথিপত্র যাচাইয়ে কিউআর কোডভিত্তিক পদ্ধতি চালুর বিষয়ে প্রস্তাব আসে। ওই দিনের আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতেই প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জারীকৃত প্রজ্ঞাপন বাস্তবায়নে দেশের ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বাড়াতে হবে বলে মনে করছেন ব্যাংক নির্বাহীরা। দেশের অন্তত তিনটি ব্যাংকের শীর্ষ নির্বাহী বণিক বার্তাকে জানিয়েছেন, কিউআর কোডের মাধ্যমে ব্যাংক স্টেটমেন্ট যাচাইয়ের যে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে সেটির বাস্তবায়ন সময় ও ব্যয়সাপেক্ষ। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে নতুন সফটওয়্যার কেনাসহ প্রযুক্তিগত কাঠামো গড়ে তুলতে হবে। আর সম্মিলিতভাবে একটি সার্ভার ব্যবহারের উদ্যোগ নিলে সেটিতেও বিনিয়োগ লাগবে। কিন্তু এ বিনিয়োগ কে করবে, আর সেবার বিপরীতে গ্রাহকদের কাছ থেকে ফি নেয়া হবে কিনা, সেটি প্রজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হয়নি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ওয়ান ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মুহিত রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বহুজাতিক ব্যাংকে চাকরি করা অবস্থায় আমি বেশ কয়েকটি দূতাবাসকে বলেছিলাম, তারা যেন এমন একটি পদ্ধতি চালু করে, যার মাধ্যমে গ্রাহকের অনুমতি সাপেক্ষে ব্যাংক স্টেটমেন্টসহ আনুষঙ্গিক নথি সরাসরি দূতাবাসের মেইলে পাঠিয়ে দেয়া যায়। এখন কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেহেতু কিউআর কোডভিত্তিক নথিপত্র দিতে বলেছে, আমরা সেটি মানতে বাধ্য। তবে এ পদ্ধতি চালু করতে হলে ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত কিছু পরিবর্তন আনতে হবে। কিউআর কোডের মাধ্যমে যাতে ব্যাংকে কোনো সাইবার হামলা না হয়, সেটিও নিশ্চিত করা জরুরি।’
ভিসা আবেদনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি জালিয়াতির অভিযোগ উঠছে ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও আর্থিক সক্ষমতার নথি নিয়ে। অনেক ক্ষেত্রে ভিসাপ্রত্যাশীরা প্রকৃত ব্যাংক হিসাবের তথ্য পরিবর্তন করে, সাময়িকভাবে টাকা জমা দেখিয়ে কিংবা সম্পূর্ণ ভুয়া স্টেটমেন্ট দিয়ে আবেদন করছেন বলে দূতাবাসগুলোর অভিযোগ। কিছু ক্ষেত্রে দালাল চক্র ও অননুমোদিত ভিসা এজেন্সি এসব নথি প্রস্তুত করে দিচ্ছে।
ঢাকায় অবস্থানরত ১৩টি পশ্চিমা দেশের মিশন গত বছর যৌথভাবে বাংলাদেশী আবেদনকারীদের ভুয়া নথি ব্যবহার না করার আহ্বান জানায়। ওই সময় বলা হয়, জাল নথি ব্যবহার করলে শুধু ভিসা বাতিল নয়, ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা, আইনি জটিলতা ও সীমান্তে ফেরত পাঠানোর ঝুঁকিও তৈরি হবে। এক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, একটি মিশন প্রায় ৩০০টি ট্যুরিস্ট ভিসা আবেদন শনাক্ত করেছে, যেগুলোর সঙ্গে একই ব্যাংকের জাল স্টেটমেন্ট সংযুক্ত ছিল। আর উত্তর মেসিডোনিয়া ও সার্বিয়ার দূতাবাসগুলো অভিযোগ করেছে, বাংলাদেশীদের জমা দেয়া বিপুলসংখ্যক ওয়ার্ক পারমিট জাল ছিল। এমনকি কিছু ক্ষেত্রে প্রায় ৯০ শতাংশ আবেদনেই ভুয়া পারমিট পাওয়া গেছে বলে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে উঠে আসে।




















