মার্কিন নিষেধাজ্ঞা ও ভূ-রাজনৈতিক নানামুখী চ্যালেঞ্জ সামলে বৈশ্বিক প্রযুক্তি শিল্পে এক অসাধারণ প্রত্যাবর্তনের গল্প লিখেছে হুয়াওয়ে। ওয়াশিংটন এবং বেইজিংয়ের মধ্যে তীব্র প্রযুক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা এই চীনা বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানটি এবার বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার স্মার্টফোন বাজারে আবারও তাদের শক্তিশালী অবস্থান ফিরে পেতে বড় ধরনের পরিকল্পনা করছে।
হুয়াওয়ে সাউথ এশিয়ার কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তারা বাংলাদেশকে তাদের নতুন ফাইভ-জি (5G) স্মার্টফোন এবং নেক্সট-জেনারেশন প্রযুক্তির অন্যতম প্রধান হাব বা লঞ্চপ্যাড (Launchpad) হিসেবে বিবেচনা করছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, হুয়াওয়ে ইতিমধ্যে ঢাকায় তাদের ‘সাউথ এশিয়া হেডকোয়ার্টার্স’ বা আঞ্চলিক সদর দফতর স্থাপন করেছে। একই সাথে দেশের প্রযুক্তি খাতের মানবসম্পদ উন্নয়ন ও গবেষণার জন্য বিভিন্ন ল্যাব (যেমন: ইউনাইটেড ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে ডিজিটাল পাওয়ার ল্যাব) তৈরি করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
হুয়াওয়ের ডিরেক্টর ফর সাউথ এশিয়া লিন হল হ্যাভেন (Lin Hall Haven) সম্প্রতি এক সংবাদ সম্মেলনে জানান, রাজনৈতিক পরিবর্তন বা সাময়িক ব্যবসায়িক ধীরগতির মধ্যেও তারা বাজারে অত্যন্ত শক্তিশালী প্রজেক্ট নিয়ে টিকে আছেন। খুব শীঘ্রই তাদের নতুন ৫জি ডিভাইসের মাধ্যমে দেশীয় স্মার্টফোন বাজারে একটি বড় মোমেন্টাম বা গতি ফিরিয়ে আনতে তারা কাজ করছেন।
২০১৯ সালে মার্কিন নীতিনির্ধারকরা দাবি করেন, হুয়াওয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় নিরাপত্তার জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে এবং চীন সরকার এই সরঞ্জাম গুপ্তচরবৃত্তির জন্য ব্যবহার করতে পারে। হুয়াওয়ে বারবার এই অভিযোগ অস্বীকার করলেও কিছু মার্কিন মিত্র দেশ (যেমন যুক্তরাজ্য) তাদের ফাইভ-জি নেটওয়ার্ক তৈরিতে হুয়াওয়য়ের ভূমিকা সীমিত করে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কাটি আসে যখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার কারণে গুগল তাদের ‘অ্যান্ড্রয়েড ওএস’ হুয়াওয়েকে সরবরাহ করা বন্ধ করে দেয়। অনেক বিশ্লেষক তখন ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, হুয়াওয়ে হয়ত স্মার্টফোন বাজার থেকে চিরতরে ছিটকে যাবে। তবে সেই ধাক্কা সামলে ২০১৯ সালের শেষভাগেই নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম ‘হারমনি ওএস’ (চীনা ভাষায় ‘হংমেং’) চালু করে বাজিমাত করে প্রতিষ্ঠানটি।
হুয়াওয়ের এই শক্তিশালী প্রত্যাবর্তন এখন বিশ্ববাজারে স্পষ্ট। তীব্র বিধিনিষেধের মধ্যেও এক বছর আগের একই সময়ের তুলনায় ২০২৪ সালের প্রথম পাঁচ মাসে হুয়াওয়ের বৈশ্বিক স্মার্টফোন বিক্রি ৭২ শতাংশ বেড়েছে।
স্মার্টফোনের বাইরেও প্রতিষ্ঠানটি এখন নতুন নতুন ব্যবসায় পা রাখছে। টেসলার বৈদ্যুতিক গাড়ির সাথে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে তারা বাজারে এনেছে প্রিমিয়াম বৈদ্যুতিক সেডান কার। পাশাপাশি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই (AI) চিপ তৈরিতেও তারা বড় সাফল্য পেয়েছে। চলতি বছরের শুরুর দিকে চিপ জায়ান্ট ‘এনভিডিয়া’ এআই সিস্টেমের প্রসেসর তৈরিতে হুয়াওয়েকে তাদের শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ঘোষণা করেছে।
হুয়াওয়ের রিচার্ড ইউ দাবি করেছেন, তাদের নিজস্ব ‘অ্যাসেন্ড’ প্রসেসর ব্যবহার করে তৈরি করা এআই কাঠামো বর্তমান মূলধারার আন্তর্জাতিক এআই কাঠামোগুলোর তুলনায় লার্জ ল্যাংগুয়েজ মডেল (LLM) প্রশিক্ষণে ১.১ গুণ বেশি কার্যকর।
বাজার সম্ভাবনা: প্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, নিজস্ব শক্তিশালী ৫জি চিপসেট এবং গুগল ছাড়াই ‘হারমনি ওএস’ দিয়ে যেভাবে হুয়াওয়ে চীনের বাজারে একচ্ছত্র আধিপত্য ফিরে পেয়েছে, ঠিক একই কৌশলে তারা বাংলাদেশের বাজারেও প্রিমিয়াম ও মিড-রেঞ্জ ৫জি সেগমেন্টে অন্য ব্র্যান্ডগুলোকে বড় চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে যাচ্ছে।





















