প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির নতুন দিগন্ত হিসেবে বিশ্বজুড়ে ভার্চুয়াল মুদ্রার বিস্তার ঘটছে দ্রুত। কিন্তু বাংলাদেশে এ মুদ্রার কেনাবেচা ও ব্যবহার আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকলেও অনলাইন ব্যাংকিং এবং ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে সহজেই ক্রিপ্টোকারেন্সি কেনার সুযোগ থাকায় অর্থ পাচারের ঝুঁকি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অ্যাপে সম্পন্ন নিয়ন্ত্রণহীন এই বাজারের আড়ালে প্রতিবছর হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।
বরং বন্ধ রাখার মাধ্যমেই এর অপব্যবহার হওয়ার সুযোগ বেশি তৈরি হচ্ছে বলে মনে করেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে ‘AI প্রযুক্তির হাতে খড়ি’ বইয়ের লেখক ও সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ আরিফ মঈনুদ্দীন বললেন, ক্রিপ্টোকারেন্সি-তে আইনে কোনো বাধা নেই তবে এটি লেনদেনে বাংলাদেশ ব্যাংকের বাধা আছে। তবে অ্যাপের মাধ্যমে এই মুদ্রা ডিসেন্ট্রালাইজড পদ্ধতিতে লেনদেন হওয়ায় এটি ঠেকানো সম্ভব নয়। ই-কমার্সসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই যেহেতু এটি বৈধ মুদ্রা হিসেবে লেনদেন হয়; ফলে কারিগরি ভাবে এটি লেনদেন ঠেকানো সম্ভবও নয়। তবে এ ধরনের মুদ্রা বিনিময়ের ক্ষেত্রে একটি রেগুলেটরি ফ্রেমওয়ার্ক থাকা জরুরি। এক্ষেত্রে মানিএক্সেচেঞ্জের মাধ্যমে ডিজিটাল মুদ্রাটি লেনদেন করতে দেয়া যেতে পারে। এতে পরিপূর্ণ মনিটরিং করা সম্ভব না হলেও ডেটার মাধ্যমে ট্রেস করা সম্ভব হবে। এতে করে সামগ্রিক আর্থিক খাতকে একটি শৃঙ্খলায় আনা যাবে।
একইভাবে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়-এর কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জুলফিকার মাহমুদ মনে করেন, শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে প্রযুক্তিনির্ভর আর্থিক ব্যবস্থা বন্ধ রাখা সম্ভব নয়। তার মতে, ভার্চুয়াল মুদ্রাকে একটি নিয়ন্ত্রিত আইনগত কাঠামোর আওতায় আনা গেলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং অর্থপাচারের ঝুঁকি কমবে। বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই হুন্ডি চক্র ও অনিয়ন্ত্রিত লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে বিদেশে অর্থ সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
প্রসঙ্গত, অর্থ বিনিময়ের ইতিহাসে ভার্চুয়াল মুদ্রা এক নতুন বাস্তবতা। প্রচলিত কাগুজে বা ধাতব মুদ্রার বিপরীতে এটি সম্পূর্ণ ডিজিটাল সম্পদ, যার লেনদেন পরিচালিত হয় ইন্টারনেটভিত্তিক নেটওয়ার্কে। ২০০৮ সালে রহস্যময় ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সাতোশি নাকামোতো প্রকাশিত গবেষণাপত্রের ভিত্তিতে ২০০৯ সালে যাত্রা শুরু করে বিশ্বের প্রথম সফল ক্রিপ্টোকারেন্সি বিটকয়েন। পরে বাজারে আসে ইথেরিয়াম, লাইটকয়েনসহ হাজারো ডিজিটাল মুদ্রা।
ব্লকচেইন প্রযুক্তির ওপর পরিচালিত এসব মুদ্রা কোনো কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর অধীনে নয়। ফলে একদিকে যেমন এটি দ্রুত, সীমান্তহীন ও বিকেন্দ্রীভূত আর্থিক ব্যবস্থার সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে অর্থপাচার, কর ফাঁকি, প্রতারণা এবং অবৈধ লেনদেনের ঝুঁকিও বাড়িয়েছে।
বাংলাদেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন বৈধ নয় বলে বারবার সতর্ক করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। তবুও অনুসন্ধানে দেখা গেছে, মোবাইল ও অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠিয়ে কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভার্চুয়াল ডলার বা ডিজিটাল মুদ্রা কেনা সম্ভব হচ্ছে। ক্রেতা অর্থ পাঠানোর পর ওয়ালেটে ডিজিটাল সম্পদ পৌঁছে গেলেও প্রকৃত বিক্রেতা কে, অর্থ কোথায় যাচ্ছে কিংবা লেনদেনের চূড়ান্ত গন্তব্য কী—সেসব তথ্য অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অজানা থেকে যাচ্ছে।
পরিচয় প্রকাশ না করে একজন ব্যবহারকারী জানান, আগ্রহী যে কেউ প্রায় যেকোনো পরিমাণ অর্থ দিয়ে ক্রিপ্টোকারেন্সি কিনতে পারেন। মোবাইলে অ্যাপে মাধ্যমে কিছু তরুণ ভার্চুয়াল মুদ্রা কেনাবেচা করে যথেষ্ট আয়ও করছে। অনলাইন ফরেক্স ট্রেডিংয়ের জন্য এরই মধ্যে এক্সনেস, এক্সএম, ওয়ানডা এবং ক্যাপিটেল ডটকম দেশের নেটিজেনদের মধ্যে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। মেটাট্রেডার কিংবা ট্রেডিংভিউ অ্যাপের মাধ্যমেও আন্তর্জাতিক ফরেক্স মার্কেটে ট্রেড করছে কেউ কেউ। আর এ কারণেই নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—এই লেনদেনের মাধ্যমে অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে কি না।
সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় ক্রিপ্টো কারেন্সির ভূমিকা পর্যালোচনায় আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠান চেইন অ্যানালাইসিস এ প্রকাশ হওয়া ২০২৫ গ্লোবাল ক্রিপ্টো অ্যাডপশন ইনডেক্সের তথ্য মতে, ক্রিপ্টো মুদ্রা ব্যবহারে ১৫১ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৩তম। বাংলাদেশে ক্রিপ্টো কারেন্সি লেনদেন নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের পর বাংলাদেশই এখন অন্যতম শীর্ষ ক্রিপ্টো ব্যবহারকারী দেশ।
আন্তর্জাতিক সংস্থা ক্রিপ্টো কাউন্সিল ফর ইনোভেশন-এর তথ্য অনুযায়ী, ভার্চুয়াল মুদ্রা ব্যবহারকারীর সংখ্যার বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে। দেশে আনুমানিক ৪৩ লাখ মানুষ কোনো না কোনোভাবে ক্রিপ্টোকারেন্সি ব্যবহার করছেন বলে ধারণা করা হয়। যদিও এই ব্যবহারকারীদের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক বা নিয়ন্ত্রণের বাইরে থাকা প্ল্যাটফর্মে সক্রিয়।
ক্রমাগতই আইন শৃঙ্খলা বাহিনী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংক এ ধরণের লেনদেনে নিষেধ করছে। গত ৩০ মার্চ ‘মেটাভার্স ফরেন এক্সচেঞ্জ’ (এমটিএফই) নামক অনলাইনভিত্তিক প্রতারণামূলক বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পাচার হওয়া প্রায় ৪৪ কোটিরও বেশি টাকার সমমূল্যের ডিজিটাল মুদ্রা দেশে ফেরতও এনেছে। তারপরও ক্রিপ্টো কারেন্সি লেনদেনে ঝোঁক বৃদ্ধি ও বর্তমনা অবস্থানের কারণ হিসেবে ধারণা করা হচ্ছে রেমিট্যান্স, গেমিং ও মুদ্রাস্ফীতির বিপরীতে সম্পদ সংরক্ষনের উপায় হিসেবে অনেক ব্যবহারকারীর ক্রিপ্টো মুদ্রার দিকে ঝুঁকে পড়াকে।
চেইন অ্যানালাইসিসের তথ্যমতে, ফ্রিল্যান্সিং ও রেমিট্যান্স একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত। বাংলাদেশের একটি বিশাল তরুণ জনগোষ্ঠী অনলাইন ফ্রিল্যান্সিংয়ের সঙ্গে যুক্ত। অনেক ক্ষেত্রে বিদেশের ক্লায়েন্টদের কাছ থেকে দ্রুত ও কম খরচে পারিশ্রমিক নিতে তারা ক্রিপ্টোকারেন্সি বিশেষ করে স্টেবলকয়েন ইউএসডিটি ব্যবহার করছেন। এ ছাড়া প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের একটি অংশ এখন বিকল্প চ্যানেল হিসেবে ক্রিপ্টোর মাধ্যমে দেশে আসছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ ছাড়া টাকার মান কমে যাওয়া ও মুদ্রাস্ফীতির হাত থেকে সঞ্চয় বাঁচাতে অনেকে তাঁদের মূলধনকে ডলারে রূপান্তর করতে চান। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ডিজিটাল মুদ্রা বা স্টেবলকয়েন রাখা সহজ হওয়ায় সাধারণ বিনিয়োগকারীরা এই পথ বেছে নিচ্ছেন। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কড়াকড়ি থাকলেও বিভিন্ন গেটওয়ে ব্যবহার করে বড় একটি অংশ ক্রিপ্টো ইকোসিস্টেমে প্রবেশ করছে। আর তাই আইনি বাধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে ডিজিটাল মুদ্রার প্রভাব ও ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান জানিয়েছেন, দেশে ক্রিপ্টোকারেন্সির সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আর্থিক গোয়েন্দা সংস্থাগুলো কাজ করছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ) এবং সিআইডি এ বিষয়ে নজরদারি অব্যাহত রেখেছে।
ই-কমার্স ব্যবসায়ের সঙ্গে জড়িত একজন ব্যাবসায়ী বলেন বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ইতোমধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সিকে কর, লাইসেন্সিং এবং আর্থিক তদারকির আওতায় এনে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিপরীতে বাংলাদেশে এখনো নিষেধাজ্ঞাভিত্তিক অবস্থান বহাল রয়েছে। ফলে প্রযুক্তির অগ্রগতির সঙ্গে বাস্তবতার ফারাক বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভার্চুয়াল মুদ্রা একদিকে ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতির সম্ভাবনাময় হাতিয়ার, অন্যদিকে যথাযথ নিয়ন্ত্রণ না থাকলে এটি অর্থপাচার, সাইবার অপরাধ ও আর্থিক ঝুঁকির বড় উৎস হয়ে উঠতে পারে। তাই নিষেধাজ্ঞা, নিয়ন্ত্রণ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করাই এখন নীতিনির্ধারকদের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।




















