দক্ষিণ এশিয়ার প্রযুক্তি বাজারে এখন এক নীরব কিন্তু তীব্র অর্থনৈতিক যুদ্ধ চলছে। এক দশক আগেও যে বাংলাদেশ মোবাইল হ্যান্ডসেটের সম্পূর্ণ আমদানিনির্ভর বাজার থেকে বেরিয়ে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ স্লোগানে স্বনির্ভরতার স্বপ্ন দেখছিল, সেই স্বপ্ন এখন খাদের কিনারায়। দেশের মাটিতে গড়ে ওঠা এক ডজনেরও বেশি আধুনিক মোবাইল কারখানা এখন অস্তিত্ব রক্ষার চরম সংকটে। উৎপাদন লাইনের সিংহভাগ বন্ধ, হাজার হাজার শ্রমিক ছাঁটাই হয়েছেন এবং শত শত কোটি টাকার দেশীয় বিনিয়োগ এখন ব্যাংক ঋণের বোঝায় পরিণত হয়েছে।
উদ্যোক্তা, অর্থনীতিবিদ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের এই উদীয়মান শিল্প খাতটি এক দিনে বা স্বাভাবিক নিয়মে সংকটে পড়েনি। এর নেপথ্যে রয়েছে একদিকে প্রতিবেশী ভারতের মোবাইল উৎপাদন শিল্পের অভাবনীয় ও আগ্রাসী বিকাশ, আর অন্যদিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ নীতিমালার ধারাবাহিকতার অভাব, ডলার সংকট এবং সীমান্ত গলিয়ে আসা চোরাই ফোনের এক বিশাল সিন্ডিকেট। প্রযুক্তি খাতের অনেকেই একে দেখছেন বাংলাদেশের সম্ভাবনাময় বাজারকে অরক্ষিত রেখে পরোক্ষভাবে ভারতের বিশাল উৎপাদন শিল্পকে একচ্ছত্র আধিপত্য পাইয়ে দেওয়ার একটি সুনির্দিষ্ট ‘নীল নকশা’ হিসেবে।
ভারতের মোবাইল শিল্পের অভাবনীয় বিকাশ ও বৈশ্বিক হাব হয়ে ওঠার গল্প
গত এক দশকে ভারতের মোবাইল উৎপাদন খাতের রূপান্তর বৈশ্বিক অর্থনীতিতে একটি বড় কেস স্টাডি। ২০১৪ সালেও ভারত যেখানে তাদের চাহিদার সিংহভাগ মোবাইল ফোন চীন বা অন্যান্য দেশ থেকে আমদানি করত, সেখানে আজ তারা বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোবাইল উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। এই অভাবনীয় সাফল্যের পেছনে কোনো জাদুমন্ত্র ছিল না, ছিল দীর্ঘমেয়াদী রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা এবং আগ্রাসী অর্থনৈতিক কূটনীতি।
১. পিএলআই (Production Linked Incentive) স্কিমের মাস্টারস্ট্রোক
ভারত সরকারের সবচেয়ে বড় সফলতার চাবিকাঠি ছিল তাদের ‘উৎপাদন ভিত্তিক প্রণোদনা’ বা পিএলআই স্কিম। এই নীতিমালার আওতায় ভারত সরকার দেশীয় ও আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোকে ভারতে উৎপাদিত মোবাইল ও যন্ত্রাংশ বিশ্ববাজারে রপ্তানি করার ওপর সরাসরি ৪ থেকে ৬ শতাংশ পর্যন্ত নগদ আর্থিক সহায়তা (Cash Incentive) প্রদান করে। অর্থাৎ, একটি কোম্পানি যত বেশি টাকার ফোন ভারতে তৈরি করে বিদেশে পাঠাবে, সরকার তাদের সরাসরি নগদ অর্থ ফেরত দেবে। এই প্রণোদনা বৈশ্বিক ম্যানুফ্যাকচারিং জায়ান্টদের জন্য এক বিশাল আকর্ষণ হিসেবে কাজ করেছে।
২. বৈশ্বিক জায়ান্টদের ভারতের মাটিতে টেনে আনা
পাকাপোক্ত সরকারি নীতি ও বিশাল অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করায় অ্যাপল (Apple), স্যামসাং (Samsung), শাওমি (Xiaomi) এবং ওপ্পো-র মতো বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি ব্র্যান্ডগুলো চীন থেকে তাদের উৎপাদন লাইনের বড় অংশ ভারতে স্থানান্তর করেছে। বর্তমানে ফক্সকন বা পেগাট্রনের মতো বিশ্বের সবচেয়ে বড় চুক্তিভিত্তিক উৎপাদকরা ভারতের চেন্নাই বা নয়ডায় বিশাল বিশাল কারখানা পরিচালনা করছে। আইফোন বা গ্যালাক্সি সিরিজের সর্বাধুনিক ফ্ল্যাগশিপ ফোনগুলো এখন ভারতের মাটিতে তৈরি হয়ে সরাসরি ইউরোপ ও আমেরিকার বাজারে যাচ্ছে।
৩. দীর্ঘমেয়াদী লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন উন্নয়ন
ভারত কেবল অ্যাসেম্বলিং বা স্ক্রু-ড্রাইভার ইন্ডাস্ট্রিতে আটকে থাকেনি। তারা মোবাইলের ডিসপ্লে, ব্যাটারি, মাদারবোর্ড এবং চার্জারের মতো কাঁচামাল বা ব্যাকওয়ার্ড লিংকেজ শিল্পও নিজেদের দেশে গড়ে তুলেছে। ফলে উৎপাদন খরচ নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। একই সঙ্গে তাদের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ বাজার যেমন বিশাল, তেমনি তারা বৈশ্বিক লজিস্টিক সাপোর্টের জন্য বন্দর ও যোগাযোগ ব্যবস্থাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করেছে। এর ফলে ভারত এখন বিশ্ববাজারে সস্তায় উদ্বৃত্ত পণ্য (Surplus Stock) খালাস করার মতো শক্তিশালী অবস্থানে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের মোবাইল শিল্পের সংকট ও খাদের কিনারায় পড়ার কারণ
ভারতের এই চোখধাঁধানো অগ্রযাত্রার ঠিক বিপরীত চিত্র দেখা যাচ্ছে বাংলাদেশে। অথচ ২০১৭ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের চিত্রটি ছিল অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক। স্যামসাং, ভিভো, শাওমি, টেকনো, ইনফিনিক্সের মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো স্থানীয় উদ্যোক্তাদের সাথে যৌথ বিনিয়োগে বাংলাদেশে কারখানা স্থাপন করেছিল। ওয়ালটন এবং সিমফনির মতো দেশি ব্র্যান্ডগুলো নিজস্ব কারখানায় ফোন তৈরি করে দেশের মোট চাহিদার প্রায় ৮০ শতাংশের বেশি অভ্যন্তরীণভাবে মেটাচ্ছিল। কিন্তু হঠাৎ করেই এই চলন্ত চাকা থমকে গেছে। বর্তমানে অর্ধেকের বেশি কারখানা বন্ধের মুখে। এর নেপথ্যে থাকা প্রধান কারণগুলো নিচে বিশদভাবে বিশ্লেষণ করা হলো:
১. চোরাই ফোনের দাপট ও ভারতের উদ্বৃত্ত পণ্যের ‘ডাম্পিং স্টেশন’
বাংলাদেশের মোবাইল শিল্পের জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ঘাতক হলো ‘গ্রে মার্কেট’ বা অবৈধ উপায়ে আসা চোরাই ফোন। বর্তমানে দেশের মোট স্মার্টফোন বাজারের প্রায় ৬০ শতাংশই এই অবৈধ সিন্ডিকেটের দখলে। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বাজার বিশেষজ্ঞদের তদন্তে দেখা গেছে, এই চোরাই ফোনের প্রায় সিংহভাগই সীমান্ত পেরিয়ে অবৈধভাবে ভারত থেকে বাংলাদেশে আসছে।
ভারতের কারখানাগুলো যখন বিপুল পরিমাণে ফোন তৈরি করে, তখন তাদের একটি বিশাল উদ্বৃত্ত অংশ (Surplus) থাকে। ভারতীয় চোরাকারবারি এবং বাংলাদেশের হুন্ডি সিন্ডিকেট মিলে এই ফোনগুলো শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বাংলাদেশে নিয়ে আসছে। বাংলাদেশে একটি বৈধ ফোন আমদানি বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে যন্ত্রাংশের ওপর প্রায় ৪১ থেকে ৬০ শতাংশ পর্যন্ত উচ্চ শুল্ক ও কর দিতে হয়। কিন্তু চোরাই পথে আসা ফোনে কোনো ট্যাক্স দিতে হয় না। ফলে এই অবৈধ ফোনগুলো বৈধভাবে দেশে উৎপাদিত বা আমদানিকৃত ফোনের চেয়ে অন্তত ১৫-২০ শতাংশ কম দামে বাজারে বিক্রি হয়। সাধারণ ক্রেতারা সস্তা পেয়ে চোরাই ফোন কিনছেন, যার ফলে দেশি কারখানাগুলোর ফোন বিক্রি তলানিতে ঠেকেছে। প্রকারান্তরে, বাংলাদেশের বাজারটি এখন ভারতের উদ্বৃত্ত পণ্য খালাসের একটি ‘ডাম্পিং স্টেশন’-এ পরিণত হয়েছে, যা বাংলাদেশের শিল্পকে ধ্বংস করে ভারতের কারখানাগুলোকে সচল রাখছে।
২. এনইআইআর (NEIR) বাস্তবায়নে রহস্যজনক দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের বাধা
অবৈধ এবং চোরাই পথে আসা মোবাইল ফোন পুরোপুরি বন্ধ করার জন্য বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ‘ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার’ (NEIR) বা কেন্দ্রীয় মোবাইল হ্যান্ডসেট নিবন্ধন পদ্ধতি চালু করেছিল। এই প্রযুক্তির মূল কাজ ছিল—কোনো ফোন যদি বৈধভাবে নিবন্ধিত না হয় বা চোরাই পথে আসে, তবে দেশের কোনো মোবাইল অপারেটরের সিম সেই ফোনে কাজ করবে না।
কিন্তু অত্যন্ত রহস্যজনক কারণে এই যুগান্তকারী প্রযুক্তিটির পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন বারবার পেছানো হয়েছে। রাজনৈতিক পটপরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতার সুযোগ নিয়ে একটি শক্তিশালী চোরাকারবারি ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এই সিস্টেমটি চালু করার বিরুদ্ধে তীব্র লবিং ও বাজারে কৃত্রিম অস্থিরতা তৈরি করেছে। এনইআইআর পুরোপুরি কার্যকর না হওয়ায় চোরাকারবারিরা অবাধে ব্যবসা করছে, সরকার প্রতি বছর প্রায় ২,০০০ কোটি টাকার রাজস্ব হারাচ্ছে এবং দেশি শিল্প ধূলিসাৎ হচ্ছে।
৩. শুল্ক কাঠামোর অস্থিরতা ও অভ্যন্তরীণ নীতিগত দুর্বলতা
একটি শিল্প বিকশিত হওয়ার জন্য অন্তত ১০ থেকে ১৫ বছরের একটি স্থিতিশীল শুল্ক ও কর নীতি প্রয়োজন। বাংলাদেশে শুরুতে স্থানীয় পর্যায়ে মোবাইল উৎপাদনে বড় ধরনের কর ছাড় বা প্রোটেক্টিভ ট্যারিফ (Protective Tariff) দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোর বাজেটে হঠাৎ করেই স্থানীয় উৎপাদনে ভ্যাট (VAT) আরোপ করা হয়েছে এবং যন্ত্রাংশ আমদানির ওপর শুল্ক বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। উল্টোদিকে, ফিনিশড বা তৈরি হ্যান্ডসেট আমদানির শুল্ক কমানোর প্রস্তাব বা আলোচনা চলছে। এই ধরনের নীতিগত অস্থিরতার কারণে বিনিয়োগকারীরা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছেন। যেখানে ভারত তাদের উদ্যোক্তাদের সরাসরি ক্যাশ ব্যাক দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ সরকার দেশি কারখানার ওপর করের বোঝা চাপাচ্ছে, যা দেশি শিল্পকে প্রতিযোগিতায় সম্পূর্ণ পঙ্গু করে দিয়েছে।
৪. ডলার সংকট এবং এলসি খোলার জটিলতা
গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে চলমান ডলার সংকট মোবাইল খাতের কফিনে শেষ পেরেকটি ঠুকে দিয়েছে। মোবাইল ফোন উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল ও মাদারবোর্ডের চিপসেট শতভাগ আমদানি করতে হয়। কিন্তু ডলারের অভাবে ব্যাংকগুলো সময়মতো ঋণপত্র বা এলসি (LC) খুলতে না পারায় কারখানাগুলো মাসের পর মাস কাঁচামাল ছাড়াই পড়েছিল। উৎপাদন বন্ধ থাকলেও কারখানার ভাড়া, ব্যাংক ঋণ এবং শ্রমিকদের বেতন ঠিকই পরিশোধ করতে হয়েছে উদ্যোক্তাদের। এই বিশাল আর্থিক লোকসান সইতে না পেরে অনেক ছোট ও মাঝারি কারখানা স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে গেছে।
বৈশ্বিক কোম্পানিগুলো কেন ভারতে যাচ্ছে, বাংলাদেশে নয়?
প্রযুক্তি খাতের একটি বড় প্রশ্ন—স্যামসাং, শাওমি বা অ্যাপল যখন ভারতে বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করে বিশাল কারখানা বানাচ্ছে, তখন বাংলাদেশে তারা কেবল নামমাত্র অ্যাসেম্বলিং প্ল্যান্ট করেই দায় সারছে কেন? এর কারণগুলো বিশ্লেষণ করলে বাংলাদেশের কাঠামোগত দুর্বলতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে:

ভারতের শক্তিশালী ইকোসিস্টেমের কারণে বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো নিশ্চিত জানে যে সেখানে বিনিয়োগ করলে দীর্ঘমেয়াদে লাভবান হওয়া যাবে। পক্ষান্তরে, বাংলাদেশের বাজারে চোরাই ফোনের অবৈধ আধিপত্য এবং নীতিমালার অনিশ্চয়তার কারণে বড় বৈশ্বিক ব্র্যান্ডগুলো এখানে দীর্ঘমেয়াদী বা ভারী উৎপাদনে যাওয়ার সাহস পাচ্ছে না।



















