বিশ্বজুড়ে ফেসবুক প্ল্যাটফর্মে কনটেন্ট ক্রিয়েটর বা ভিডিও নির্মাতাদের ধরে রাখতে এবং তাদের কাজের পরিধি বাড়াতে সম্পূর্ণ নতুন একটি ‘এআই ক্রিয়েটর অ্যাসিস্ট্যান্ট’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত সহকারী উন্মোচন করেছে সোশ্যাল মিডিয়া জায়ান্ট মেটা।
গত বৃহস্পতিবার এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে মেটা জানায়, এই নতুন এআই অ্যাসিস্ট্যান্টটি একজন ক্রিয়েটরের নিজস্ব কনটেন্ট শৈলী, পূর্ববর্তী পারফরম্যান্স, ফলোয়ার বা কমিউনিটির ধরন এবং ভবিষ্যৎ লক্ষ্য বিশ্লেষণ করে সম্পূর্ণ ব্যক্তিগতকৃত বা কাস্টমাইজড পরামর্শ দেবে।
সাধারণত কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের তাদের পেজের পারফরম্যান্স বা রিচ বুঝতে বিভিন্ন জটিল চার্ট, গ্রাফ এবং অ্যানালিটিক্স ড্যাশবোর্ড ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে বিশ্লেষণ করতে হয়। মেটার এই নতুন চ্যাটবট বা এআই সহকারীর ফলে এখন আর সেই ঝক্কি পোহাতে হবে না। ক্রিয়েটররা খুব সহজে সাধারণ কথ্য ভাষায় এই এআই-কে জিজ্ঞেস করতে পারবেন—‘আমার পেজে কখন পোস্ট করা সবচেয়ে ভালো?’ কিংবা ‘আমার ভিডিওর কমেন্ট বক্সে দর্শকেরা সাধারণত কী ধরনের কথা বলছেন?’।
যেহেতু এই এআই অ্যাসিস্ট্যান্টটি সম্পূর্ণ দ্বিপাক্ষিক কথোপকথন বা কনভারসেশনাল মোডে কাজ করে, তাই ক্রিয়েটররা যেকোনো বিষয়ে আরও গভীরে গিয়ে ফলো-আপ প্রশ্নও করতে পারবেন; যেমন—‘সময়ের সাথে সাথে আমার দর্শক বা অডিয়েন্সের বয়স বা পছন্দের ক্যাটাগরিতে কী ধরনের পরিবর্তন এসেছে?’। এআই চ্যাটবটটি ক্রিয়েটরের নিজের পেজের আসল ডেটা ট্র্যাক করে অত্যন্ত নিখুঁত জবাব দেবে এবং পারফরম্যান্স আরও উন্নত করতে কী কী পরিবর্তন আনা দরকার, তারও একটি সুস্পষ্ট গাইডলাইন দেবে।
ট্রেন্ড অ্যানালাইসিস ও নতুন কনটেন্টের আইডিয়া
শুধু পেজের পারফরম্যান্স যাচাই করাই নয়, নতুন কনটেন্ট তৈরির ক্ষেত্রে আইডিয়া বা ‘ব্রেইনস্টর্মিং’ করার কাজেও সাহায্য করবে এই সহকারী। বর্তমানে ফেসবুকে কী কী বিষয় বা মিউজিক ট্রেন্ডিংয়ে রয়েছে, তা বিশ্লেষণ করে এটি ক্রিয়েটরদের নতুন কনটেন্টের আইডিয়া দেবে। উদাহরণস্বরূপ, এটি ক্রিয়েটরকে সাজেস্ট করতে পারে যে—বর্তমানে কোন অডিও গানটি ব্যবহার করলে রিলস ভাইরালে সুবিধা হবে কিংবা কোনো বিশেষ সাংস্কৃতিক বা বৈশ্বিক উৎসবকে কেন্দ্র করে কী ধরনের কনটেন্ট বানানো উচিত।
মেটা জানিয়েছে, প্রাথমিক পর্যায়ে এই নতুন এআই সহকারীটি যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা এবং ভারতের কনটেন্ট ক্রিয়েটরদের জন্য রোলআউট করা হচ্ছে। খুব শীঘ্রই এতে আরও নতুন নতুন ফিচার যুক্ত করে বিশ্বের অন্যান্য দেশেও এটি চালু করা হবে। গেমিং ও ভিডিও বাজারে টিকটক এবং ইউটিউব-এর সাথে তীব্র প্রতিযোগিতায় ফেসবুক ক্রিয়েটরদের ধরে রাখতেই মেটার এই বড় চাল। এর ফলে ক্রিয়েটরদের আইডিয়া খোঁজার জন্য চ্যাটজিপিটির মতো তৃতীয় পক্ষের অ্যাপের দ্বারস্থ হতে হবে না, যা তাদের মেটার নিজস্ব ইকোসিস্টেমের ভেতরেই আটকে রাখবে।
রিলসের জন্য এআই অনুবাদ ও লিপ-সিঙ্ক প্রযুক্তি
এই ইভেন্টে মেটা তাদের ফেসবুক ভিডিও ও রিলসের জন্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত অনুবাদ ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি নতুন ভাষার সংযোজন করেছে, যার মধ্যে রয়েছে আরবি, বাহাসা ইন্দোনেশিয়ান, ফ্রেঞ্চ, থাই এবং ভিয়েতনামিজ। এই ‘এআই-ট্রান্সলেটেড রিলস’ ফিচারের সবচেয়ে বড় বৈপ্লবিক দিক হলো—এটি অনুবাদের সময় ক্রিয়েটরের নিজস্ব কণ্ঠস্বরের স্বকীয়তা, টোন এবং আওয়াজ অবিকল বজায় রেখে সেটিকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করে। এর ফলে ভাষার দেয়াল ভেঙে ক্রিয়েটররা খুব সহজে আন্তর্জাতিক দর্শকদের কাছে পৌঁছাতে পারছেন।
অনুবাদকে আরও বাস্তবসম্মত ও নিখুঁত করতে মেটা এতে একটি নতুন ‘লিপ-সিঙ্ক’ ফিচারও যুক্ত করেছে, যা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে অনূদিত ভাষার শব্দের সাথে ক্রিয়েটরের ঠোঁটের নড়াচড়াকে নিখুঁতভাবে মিলিয়ে দেয়। মেটার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে প্রতি সপ্তাহে বর্তমানে ৫০ কোটিরও বেশি (হাফ বিলিয়ন) ব্যবহারকারী এই ধরনের এআই-অনূদিত ভিডিও দেখছেন। এআই প্রযুক্তির এই নতুন সংযোজন আগামী দিনে ফেসবুকের রিচ এবং ব্যবহারকারীদের ব্যস্ততা বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞরা।


















