দেশের সামগ্রিক প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, গবেষণা ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনকে গতিশীল করার লক্ষ্যে নতুন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জন্য মোট ১৮ হাজার ১১৫ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার (১১ জুন) বিকেলে জাতীয় সংসদে পেশ করা নতুন সরকারের প্রথম ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার মেগা বাজেটে এই বিশেষ বরাদ্দের কথা জানানো হয়। প্রস্তাবিত এই মোট বরাদ্দের মধ্যে দৈনন্দিন প্রাতিষ্ঠানিক বা পরিচালন ব্যয় খাতে ৭১১ কোটি টাকা এবং গবেষণা ও উন্নয়নমূলক প্রকল্প বা উন্নয়ন ব্যয় খাতে ১৭ হাজার ৪০৪ কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
আর্থিক খাতের তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের এই নতুন বরাদ্দটি চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের ২০ হাজার ৬৫৮ কোটি টাকার তুলনায় কিছুটা কম হলেও মূল বাজেটের ১৫ হাজার ১৩ কোটি টাকার তুলনায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বেশি। প্রসঙ্গত, চলতি অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটে মন্ত্রণালয়টির প্রাথমিক বরাদ্দ ছিল ১৭ হাজার ৭৯২ কোটি টাকা।
এছাড়া বিগত ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ খাতে প্রকৃত ব্যয়ের পরিমাণ ছিল ১০ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা। পরবর্তীতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের মূল বাজেটে এ খাতে ১৩ হাজার ৫৭৩ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হলেও সংশোধিত বাজেটে তা কিছুটা কমে দাঁড়ায় প্রায় ১২ হাজার ৭৯৯ কোটি টাকা। সেই ধারাবাহিকতায়, পূর্ববর্তী মূল বাজেটের তুলনায় আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের নতুন বাজেটে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে প্রকৃত বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি পেয়েছে ৫ হাজার ৩১৬ কোটি টাকা। এই বর্ধিত বরাদ্দ দেশের বিজ্ঞান চর্চা, আইসিটি অবকাঠামো এবং মেধাভিত্তিক উদ্ভাবন প্রকল্পগুলোকে আরও বেগবান করবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট খাত বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে ১১ জুন, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট বক্তৃতায় অর্থ এবং পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আইসিটি এবং টেলিকম একটি বিপুল সম্ভাবনাময় সেক্টর। এ সেক্টর হতে পারে আগামী দিনে বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকা শক্তি। অথচ বর্তমানে দেশের জিডিপিতে এ খাতের অবদান মাত্র ১-২ শতাংশ। যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের মাধ্যমে আগামী পাঁচ বছরে তা ১০ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এছাড়াও বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সময়ে চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের প্রযুক্তিগুলো বৈশ্বিক অর্থনীতির চালিকা শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। এবারের বাজেটে অটোমেশন ও চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে উদ্ভূত সুযোগ কাজে লাগিয়ে দক্ষ জনশক্তি তৈরি করাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। সরকারের নির্বাচনী ইশতেহার ২০২৬ অনুযায়ী বিজ্ঞানমনস্ক জাতি গঠনের মাধ্যমে প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং আধুনিক ও কর্মমুখী শিক্ষার প্রতি আগ্রহ সৃষ্টি আমাদের অন্যতম অগ্রাধিকার। এ লক্ষ্যে এসটিইএম (সায়েন্স, টেকনোলজি, ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড ম্যাথেমেটিক্স) শিক্ষাকে তৃণমূল পর্যায়ে পৌঁছে দেওয়া এবং গবেষণাকে সরাসরি বিশ্ব বাজারের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। আমরা প্রচলিত গবেষণার গ-ি পেরিয়ে রিসার্চ টু মার্কেট (আর টু এম) এবং ইনোভেট টু মার্কেট (১২এম) কৌশল গ্রহণ করেছি। এর মাধ্যমে উদ্ভাবিত প্রযুক্তি বা পণ্য সরাসরি বাণিজ্যিকীকরণে সহায়তা করা হবে। এছাড়া মহাকাশ গবেষণা, সেমিকন্ডাক্টর প্রযুক্তি এবং ভূমিকম্প ও সিসমোগ্রাফি গবেষণায় নিজেদের অবস্থান তৈরিতে নতুন করে উদ্যোগ গ্রহণের পরিকল্পনাও হাতে নেয়া হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, দেশের সাধারণ মানুষের দোরগোড়ায় সাশ্রয়ী মূল্যে উন্নত প্রযুক্তিনির্ভর পরমাণু চিকিৎসা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে ব্যাপক কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। দেশের একটি ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটসহ ২২টি পরমাণু চিকিৎসা ইনস্টিটিউটের মাধ্যমে সাধারণ ও পরমাণু চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণে অনলাইন নেটওয়ার্কিংভিত্তিক একটি ‘সমন্বিত নিউক্লিয়ার মেডিসিন তথ্য ব্যবস্থা’ স্থাপনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। সমুদ্র উপকূলীয় ও নদীবিধৌত দ্বীপ এলাকায় বিরল খনিজ অনুসন্ধানে ভূতাত্ত্বিক গবেষণার সক্ষমতা বৃদ্ধির পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। সেন্টমার্টিনে প্রবাল পুনরুদ্ধার এবং উপকূলীয় অগভীর সমুদ্রে বায়ুপ্রবাহ বিশ্লেষণ করে অফশোর উইন্ড এনার্জির ম্যাপিংয়ের মাধ্যমে টেকসই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে।




















