দ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পর গত জুনে অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল এমনকি ভুতুড়ে বিল আসার অভিযোগ করছেন বিভিন্ন বিতরণ কোম্পানির অনেক গ্রাহক। বিশেষ করে স্বাভাবিক বিলের চেয়ে বেশি বিল, বিদ্যুতের প্রিপেইড মিটার রিচার্জে শতাধিকের ওপর টোকেন নাম্বার নিয়ে গ্রাহকের ভেতরে নানা ধরনের অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। অতিরিক্ত বিলের বিষয়ে তদন্ত, বিল-সংক্রান্ত অভিযোগ বিতরণ কোম্পানিগুলোকে দ্রুত নিষ্পত্তির কথা বলা হলেও গ্রাহকের মধ্যে এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। বাড়তি বিলের চাপে অনেক গ্রাহক ক্ষোভও প্রকাশ করেছেন। যদিও এসবের বিষয়ে গতকাল ব্যাখ্যা দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। সেখানে বলা হয়েছে, শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধি নয়, বরং ব্যবহার বৃদ্ধিতেও জুনের বিদ্যুৎ বিল বেশি এসেছে। এছাড়া অধিকাংশ অভিযোগ ভুল বোঝাবুঝি থেকে হয়েছে বলেও জানানো হয়।
রাজধানীর কলাবাগানের বাসিন্দা মনসুর আলম। ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি (ডিপিডিসি) প্রিপেইড মিটারের আবাসিক গ্রাহক। প্রতি মাসে গড়ে তার সাড়ে তিন থেকে ৪ হাজার টাকা বিদ্যুৎ বিল আসে। এ পরিমাণ বিল তিনি তার মিটারে বিভিন্ন ধাপে রিচার্জ করেন। জুনে আকস্মিকভাবে তার প্রিপেইড মিটারটির সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিতরণ কোম্পানি ডিপিডিসি থেকে তিনি জানতে পারেন, তার মিটারে পর্যাপ্ত টাকা না থাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। বিষয়টি নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন হয়ে ডিপিডিসির আঞ্চলিক অফিসে গিয়ে জানতে পারেন, স্বংয়ক্রিয় মিটার হলেও তার প্রতিদিনকার বিদ্যুৎ ব্যবহারের রিডিং আসছে না। কখনো দৈনিক, কখনো ১০ দিনের, আবার কখনো দুই সপ্তাহের রিডিং একসঙ্গে আসায় তার মনে প্রশ্ন তৈরি হয় কেন এ পরিস্থিতি হলো। এ বিষয়ে তার মিটারটি ঠিকমতো কাজ করছে কিনা, তার সঠিক উত্তর পাননি ডিপিডিসি কর্মকর্তাদের কাছ থেকে। একধরনের ব্যাখ্যা নিয়ে তিনি চলে এলেও বিল বৃদ্ধির বিষয়টি তার কাছে অস্বাভাবিক ও মিটার রিডিং নিয়ে প্রশ্ন থেকে গেছে।
রাজধানীর মিরপুরের খেজুরতলা এলাকার ডেসকোর আবাসিক গ্রাহক তপন কুমার। তার বিদ্যুৎ বিলের ভোগান্তি নিয়ে বড় ধরনের প্রশ্ন না থাকলেও বিদ্যুৎ বিল রিচার্জ নিয়ে বড় ধরনের ভোগান্তির অভিযোগ করছেন। প্রিপেইড মিটার রিচার্জে শতাধিকের ওপর টোকেন নাম্বার, বারবার মিটারে নাম্বার ইনপুটে ভুল এবং মিটারের সঙ্গে ডেসকো অ্যাপসের কোনো সংযোগ না থাকায় ঠিক কত টাকা তার মিটারে আছে তা তিনি জানতে পারেন না। বিষয়টি নিয়ে ডেসকো কর্তৃপক্ষকে দফায় দফায় জানিয়েও কোনো সমাধান পাননি। এখন তিনি প্রতি মাসে মিটারে টাকা রিচার্জ করলেও একধরনের আতঙ্কে থাকেন কখন বিদ্যুৎ চলে যায়।
প্রিপেইড মিটার থেকে শুরু করে সাধারণ মিটারের গ্রাহকদের অনেকে সম্প্রতি এ প্রতিবেদককে বিদ্যুতের বাড়তি বিল, দ্রুত প্রিপেইড মিটারে টাকা শেষ হয়ে যাওয়া, বিল নিয়ে ভোগান্তির সমাধান না পাওয়ার অভিযোগ ও বিরক্তির কথা জানিয়েছেন। বিশেষ করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পর গত মাস থেকে এমন অভিযোগ গ্রাহকদের কাছ থেকে প্রায়ই আসছে।
রাজধানীর ডেসকো এলাকায় এমনও গ্রাহক পাওয়া গেছে, যার প্রতি মাসে গড়ে সাড়ে চার হাজার থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৭ হাজার টাকা পর্যন্ত বিদ্যুৎ বিল আসে। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে সেই বিল মাসের ব্যবধানে ১৫ হাজার টাকার হয়ে গেছে। বিল বৃদ্ধির এ হারের বিষয়ে নিয়ে ডেসকো কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলেও সন্তোষজনক কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। বরং বাড়তি বিল আসার কারণ মিটার-সংক্রান্ত হতে পারে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে বিতরণ কোম্পানির কাছ থেকে সুনির্দিষ্ট কোনো উত্তরও পাননি।
গ্রাহকের বিদ্যুৎ বিল বাড়তি আসার ঘটনা নতুন নয়। অতীতে ভুতুড়ে বিল নিয়ে তদন্তে কারিগরি ত্রুটি, মিটারে সমস্যা ও ঠিকমতো মিটার রিডিং না করার মতো তথ্যপ্রমাণও সামনে আসে। তবে এবারের বিল বৃদ্ধির বিষয়টিতে এ ধরনের কোনো ঘটনা নয়, বরং বিদ্যুতের ব্যবহার বৃদ্ধি এবং স্ল্যাব পরিবর্তনের কারণে এমনটি ঘটেছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুতের বাড়তি বিলের বিষয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত গতকাল বলেন, ‘বিদ্যুৎ বিল নিয়ে অধিকাংশ অভিযোগ ভুল বোঝাবুঝির কারণে হয়েছে। এগুলো সমাধান করা হয়েছে।’ গতকাল বিদ্যুৎ ভবনের বিজয় হলে বিদ্যুৎ বিভাগ আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ কথা বলেন বিদ্যুৎ প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘যতগুলো অভিযোগ আমাদের গোচরীভূত হয়েছে, আমরা প্রত্যেকটা ইনডিভিজুয়ালি অ্যাড্রেস করেছি। অ্যাড্রেস করতে গিয়ে আমরা দেখেছি এর অধিকাংশই আসলে ভুল বোঝাবুঝির কারণে। কারণ গ্রাহক অধিকাংশ ক্ষেত্রে মে মাসের সঙ্গে এপ্রিলের তুলনা করেছে। গত বছরের জুনের সঙ্গে যখন তুলনা করছে, তখন দেখা যাচ্ছে অধিকাংশের সঙ্গে এটা ম্যাচ করছে।’
ওই অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎ খাতে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার, জনকল্যাণে গৃহীত ব্যবস্থা, মিটারের ভাড়া এবং জুনের বিদ্যুৎ বিল-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য তুলে ধরেছে বিদ্যুৎ বিভাগ।
বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, অধিকাংশ ক্ষেত্রে জুনের বিল বৃদ্ধি শুধু ট্যারিফ বৃদ্ধির কারণে নয়, বরং বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণেও হয়েছে। আবাসিক গ্রাহকদের ক্ষেত্রে ব্যবহারের পরিমাণ বাড়লে উচ্চতর স্ল্যাবে বিল গণনা হওয়ায় মোট বিল তুলনামূলক বেশি হতে পারে। তবে কয়েকটি ক্ষেত্রে কিছু করণিক ভুল পাওয়া যাচ্ছে, সেগুলোর বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে যথাযথ প্রতিকার দেয়া হচ্ছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের লিখিত বক্তব্য তুলে ধরেন সচিব মিরানা মাহরুখ। তিনি বলেন, ‘যেসব বিদ্যুৎ বিলকে ভুতুড়ে বিল বলা হয়েছে, সেগুলো যাচাই করা হয়েছে। অনেক বিলে কোনো যান্ত্রিক ত্রুটি পাওয়া যায়নি। ব্যবহার বৃদ্ধি ও দাম বাড়ার কারণে বিল বেড়েছে। যাচাইয়ের পর গ্রাহক সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন। কিছু ক্ষেত্রে করণিক ভুল হয়েছে, যা সংশোধন করা হয়েছে।’
জুনে গ্রাহকদের অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল পাওয়ার অভিযোগ এবং সাম্প্রতিক লোডশেডিং পরিস্থিতি নিয়ে ২ জুলাই বিদ্যুৎ বিভাগের মতবিনিময় ও পর্যালোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। ওই সভায় অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল-সংক্রান্ত অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য গ্রাহকদের সংশ্লিষ্ট বিতরণ সংস্থার সঙ্গে সরাসরি বা হটলাইনের মাধ্যমে যোগাযোগের বিষয়ে সিদ্ধান্ত হয়। বিতরণ কোম্পানিগুলোর হটলাইন নাম্বার বিল-সংক্রান্ত সমস্যার বিষয়ে জানাতে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এক বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশ করা হয়।
এদিকে গতকাল রাজধানীর রিপোর্টার্স ইউনিটিতে আয়োজিত ক্যাবের এক সেমিনারে ভুতুড়ে বিল প্রসঙ্গে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘বিদ্যুৎ বেশি ব্যবহার করার কারণে স্ল্যাব পরিবর্তন হয়ে গেছে। বিল বেড়ে গেছে। মধ্যম ও নিম্নমধ্যম ইনকামের মানুষের বাসায় এয়ারকন্ডিশন রয়েছে। সেই এয়ারকন্ডিশন চলে। নানা কারণে বিদ্যুতের বিল বাড়তে পারে। তার পরেও আমি বলছি না আমাদের লোকজন সৎ। যদিও ডিজিটাল ও প্রিপেইড মিটার দিয়ে কিছুটা কমছে (দুর্নীতি)। বিল নিয়ে আমরা পুরো ইউটিলিটিকে নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করতেছি। যেসব জায়গায় অভিযোগ আসছে সেগুলো চেক করছি। আমাদের কাছে একটা রিপোর্ট আসছে। ফলে কিছু সমস্যা আছে।’ তিনি বিষয়গুলো চেক করে প্রতিবেদন করারও অনুরোধ জানান।




















