দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো, গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পরিকাঠামো (CII), ব্যাংক ও দ্রুত বর্ধনশীল ক্যাশলেস অর্থনীতিকে সাইবার আক্রমণের ঝুঁকি থেকে সুরক্ষায় দুটি নতুন কেন্দ্রীয় ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম চালু করেছে জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সি (NCSA)। ৪ আগস্ট (মঙ্গলবার) রাজধানীর আগারগাঁওয়ের বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) মিলনায়তনে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘সাইবার ইনসিডেন্ট রিপোর্টিং সিস্টেম’ (CIRS) এবং ‘ন্যাশনাল আইসিটি অ্যান্ড সাইবার সিকিউরিটি রেটিং সিস্টেম’ (NRS)-এর উদ্বোধন করা হয়। একই সঙ্গে উন্মোচন করা হয় ‘জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি স্ট্র্যাটেজি ২০২৬-২০৩০’-এর প্রাথমিক খসড়া, যেখানে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বিশ্বের শীর্ষ ২০টি সাইবার সুরক্ষিত দেশের তালিকায় উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম মতপ্রকাশের স্বাধীনতার নামে ব্যক্তিগত চরিত্রহনন ও অনলাইন হয়রানি গ্রহণযোগ্য নয় বলে সাফ জানিয়ে দেন। তিনি বলেন, “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানহানিকর ও চরিত্রহননমূলক কনটেন্ট নিয়ে জনপ্রতিনিধিসহ বিভিন্ন মহল থেকে অভিযোগ উঠছে। এ ধরনের কনটেন্ট অনেক তরুণ-তরুণীকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করছে, এমনকি কেউ কেউ আত্মহত্যাপ্রবণ অবস্থায়ও পৌঁছে যায়। চরিত্রহননমূলক কনটেন্ট ছড়ানোর প্রবণতা মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্ল্যাটফর্মগুলোর সঙ্গে নীতিগত আলোচনা চলছে এবং উত্তরণের উপায় খোঁজা হচ্ছে।” মন্ত্রী আরও বলেন, “জাতীয় সাইবার সিকিউরিটি স্ট্রাটেজি ২০২৬-২০৩০ আগামী পাঁচ বছরের জন্য দেশের সাইবার নিরাপত্তার একটি নতুন রূপরেখা। CIRS নাগরিকদের সঙ্গে সরকারের কার্যকর সেতুবন্ধন হিসেবে কাজ করবে এবং NRS সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সাইবার নিরাপত্তার দুর্বলতা চিহ্নিত করে জাতীয় সক্ষমতার একটি নির্ভরযোগ্য ভিত্তি তৈরি করবে। একই সঙ্গে জনগণের সচেতনতা বৃদ্ধির বিকল্প নেই।”
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ বলেন, “সাইবার নিরাপত্তা শুধু সরকারের একার দায়িত্ব নয়। সরকার, বেসরকারি খাত এবং সাধারণ জনগণকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। অপতথ্য ও গুজব মোকাবিলায়ও সবার সম্মিলিত অংশগ্রহণ প্রয়োজন। ব্যাংকিং, টেলিযোগাযোগসহ বেসরকারি খাত ও সরকারি খাতের সব পর্যায়ে নিরাপত্তা সক্ষমতা বাড়াতে হবে। দেশে ভুয়া তথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য, ট্রলিং, ব্যক্তিগত হয়রানি ও মানহানি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে। শুধু রিপোর্টিং ব্যবস্থায় এ সমস্যার সম্পূর্ণ সমাধান হবে না। আগামী দিনে সাইবার হামলার ঝুঁকি আরও বাড়বে, তাই নতুন প্রজন্মকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), সাইবার নিরাপত্তা এবং ক্লাউড কম্পিউটিংয়ে দক্ষ করে তুলতে এখন থেকেই বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি নিতে হবে।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান জানান, নতুন এই উদ্যোগ দুটি ব্যাংকিং খাতের বিদ্যমান সাইবার ঝুঁকি কমানো ও আগাম সতর্কতা জারিতে কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
বিটিআরসির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) এমদাদ উল বারী বলেন, “CIRS এতদিন চালু না হওয়ার পেছনে কিছু কাঠামোগত ও সমন্বয়গত সীমাবদ্ধতা ছিল। এই প্ল্যাটফর্ম তথ্যপ্রযুক্তি, যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং সাইবার নিরাপত্তার বিদ্যমান সমন্বয় ঘাটতি কমাতে সহায়তা করবে। তবে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা বিশ্বের সব সরকারের জন্যই জটিল নীতিগত বিষয়; স্বাধীনতা ও নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা একটা বড় চ্যালেঞ্জ।”
সভাপতির বক্তব্যে তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা বলেন, “আমরা সবাই সাইবার ঝুঁকির মধ্যে আছি, তাই আমাদের বসে থাকা চলবে না। সরকার সাইবার বুলিং, সাইবার সিকিউরিটি এবং সিটিজেন ডাটা প্রোটেকশনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। নাগরিকরা যেন রিয়েল টাইমে ঝুঁকির বিষয় জানাতে পারেন, সে জন্য এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।”
এনসিএসএ-এর মহাপরিচালক মো. তৈবুর রহমান জানান, নতুন ব্যবস্থার আওতায় দেশের সব গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিজ নিজ ড্যাশবোর্ডের মাধ্যমে সাইবার নিরাপত্তার মান পর্যবেক্ষণ করতে পারবে এবং ৯টি ভিন্ন ক্যাটাগরিতে সুরক্ষা মূল্যায়ন করে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এনআরএস রেটিং প্রদান করা হবে। তথ্যপ্রযুক্তি বিশ্লেষকদের মতে, প্ল্যাটফর্ম দুটির সফল বাস্তবায়নে সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সক্রিয় অংশগ্রহণ, নিয়মিত সিকিউরিটি অডিট এবং দ্রুত ইনসিডেন্ট রেসপন্স নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।





















