দেশে একের পর এক হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক নির্মাণ এবং এসব প্রকল্পে ক্রমাগত বাজেট বরাদ্দের পরও প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না বলে মনে করছেন প্রযুক্তি খাতের উদ্যোক্তা, গবেষক ও সংশ্লিষ্টরা।
তাদের মতে, হাইটেক পার্ক নির্মাণে ভৌত অবকাঠামোকে অগ্রাধিকার দেওয়া হলেও দক্ষ জনবল তৈরি, শিল্প-একাডেমিয়া সংযোগ, প্রশিক্ষণ, ইউটিলিটি সুবিধা এবং উদ্যোক্তাদের ব্যবসায়িক সহায়তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথেষ্ট গুরুত্ব পায়নি। ফলে পার্ক স্থাপনের লক্ষ্য ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে তৈরি হয়েছে বড় ধরনের ব্যবধান।
পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) ‘আজকের অ্যাজেন্ডা’ ভার্চুয়াল সিরিজের সর্বশেষ পর্বে শনিবার ‘হাইটেক পার্কস: মিশন কী? বাস্তবতা কী?’ শীর্ষক আলোচনায় বক্তারা এসব কথা বলেন।
আলোচনায় নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. এম. রকনুজ্জামান বলেন, ২০০৯ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ৩৯টি হাইটেক ও সফটওয়্যার টেকনোলজি পার্ক গড়ে তোলা হয়েছে।
তার ভাষ্য, অবকাঠামো তৈরি করলেই হাইটেক শিল্পে বিপ্লব ঘটবে এবং বিনিয়োগ আসবে—এমন ধারণা থেকেই মূলত এসব উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু সহায়ক ইকোসিস্টেম, দক্ষ মানবসম্পদ এবং শিল্পের সঙ্গে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যকর সংযোগ তৈরিতে পর্যাপ্ত মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
ফলে এখন পর্যন্ত পাওয়া ফলাফল ওই ধারণার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট করেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ ক্ষেত্রে তাইওয়ান, দক্ষিণ কোরিয়া, মালয়েশিয়া ও সিঙ্গাপুরের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য ভিন্ন পথ দেখায় বলেও উল্লেখ করেন অধ্যাপক রকনুজ্জামান।
ইকোসিস্টেমের অভাবে যশোরে সংকট
যশোর হাইটেক পার্কের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে পার্কটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ মহিদুল ইসলাম বলেন, ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে প্রতিষ্ঠিত এই পার্কে বর্তমানে ৪০টি কোম্পানি রয়েছে।
তবে এসব প্রতিষ্ঠানকে প্রয়োজনীয় ইকোসিস্টেম সহায়তা না দিয়ে অনেকটা নিজেদের মতো করে টিকে থাকার চেষ্টা করতে হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তার মতে, কর্তৃপক্ষ অনেক ক্ষেত্রে কোম্পানিগুলোকে উদ্যোক্তা বা অংশীদার হিসেবে না দেখে শুধু ভাড়াটে হিসেবে বিবেচনা করছে। পাশাপাশি প্রশিক্ষিত কর্মীদের ধরে রাখা, স্থাপনার রক্ষণাবেক্ষণ এবং তুলনামূলক বেশি ইউটিলিটি খরচও পার্কটির বড় সমস্যা।
রাজশাহীতে সম্ভাবনা থাকলেও সহায়তা সীমিত
অন্যদিকে রাজশাহী হাইটেক পার্কের অভিজ্ঞতায় তুলনামূলক ইতিবাচক চিত্র তুলে ধরেন নেট্রো সিস্টেমস লিমিটেড ও টেলজেনের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আশাফুদ্দোজা শিশির।
তিনি বলেন, প্রযুক্তি উদ্যোগের ক্ষেত্রে রাজশাহী বাংলাদেশের একটি বিরল সফল উদাহরণ। ২০১৬ সালে একটি ইনকিউবেশন সেন্টার থেকে যাত্রা শুরু করা কয়েকটি প্রযুক্তি উদ্যোগ এরই মধ্যে বৈশ্বিক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
তবে হাইটেক পার্কে কোম্পানিগুলোর জন্য বাস্তব সুবিধা এখনো মূলত কর অব্যাহতির মধ্যেই সীমিত বলে মন্তব্য করেন তিনি। স্টার্টআপগুলোর জন্য কর্তৃপক্ষের সরাসরি সহায়তাও প্রায় নেই বলে জানান এই উদ্যোক্তা।
‘প্রতিশ্রুতির চক্রে’ আটকে পার্ক
ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেডের চেয়ারপারসন ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফারহানা এ. রহমান বলেন, হাইটেক পার্ক নিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতির একটি দীর্ঘ চক্র তৈরি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে পার্ক নির্মাণ করা হলেও বাস্তবে প্রত্যাশিত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না।
বেসিসের সঙ্গে কাজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, কালিয়াকৈর হাইটেক পার্কে জমির প্লট বরাদ্দ পাওয়ার পরও প্রয়োজনীয় সহায়ক সেবা না থাকায় পরবর্তী সময়ে অনেকে তাদের বরাদ্দ ফিরিয়ে দিয়েছেন।
শুধু কর সুবিধা নয়, দরকার প্রযুক্তি উৎপাদন
হাইটেক পার্কগুলোর পরিকল্পনা ও সরকারি নীতির মধ্যে অসঙ্গতির বিষয়টি তুলে ধরেন ডিএনএস সফটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক রফেল কবির।
তিনি বলেন, শুধু রপ্তানি কর প্রণোদনার ওপর নির্ভর না করে হাইটেক পার্কগুলোর লক্ষ্য হওয়া উচিত ছিল মাদারবোর্ড ও চিপ ফ্যাব্রিকেশনের মতো মৌলিক প্রযুক্তি উৎপাদনের সক্ষমতা তৈরি করা।
একই সঙ্গে ইপিজেডের মতো মানসম্মত অবকাঠামো ও সুবিধা নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
ভুল জায়গায় পার্ক নির্মাণের অভিযোগ
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ে বাংলাদেশের প্রধান উপদেষ্টার সাবেক বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমেদ তাইয়েব হাইটেক পার্কের স্থান নির্বাচনের বিষয়টিকে অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তার মতে, বিদ্যমান ইপিজেড বা বাণিজ্যিক কেন্দ্রের সঙ্গে সংযুক্ত না করে অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল এলাকায় এসব পার্ক স্থাপন করা হয়েছে। স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড নেই—এমন এলাকায় ভারী ভৌত অবকাঠামো নির্মাণই বাংলাদেশের হাইটেক পার্কগুলোর অন্যতম বড় ব্যর্থতা বলে মন্তব্য করেন তিনি।
শুধু অবকাঠামো নয়, প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সাবেক এই বিশেষ সহকারী।
প্রয়োজন ‘সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার’
আলোচনার সমাপনী বক্তব্যে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘমেয়াদে সফল হতে হলে শুধু ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের ওপর নির্ভর করলে হবে না। দক্ষ মানবসম্পদ, সফট ইনফ্রাস্ট্রাকচার এবং শিল্পের প্রয়োজনভিত্তিক প্রশিক্ষণ ব্যবস্থাও গড়ে তুলতে হবে।
আলোচনায় অংশ নেওয়া বক্তারা অবশ্য হাইটেক পার্কের বর্তমান মডেল পুরোপুরি বাতিল করার পক্ষে মত দেননি। বরং প্রয়োজনীয় ইউটিলিটি সুবিধা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং কার্যকর ব্যবসায়িক সহায়তা নিশ্চিত করে মডেলটিকে নতুনভাবে সাজানোর ওপর জোর দেন তারা।
তাদের মতে, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে শুধু ভাড়াটে হিসেবে বিবেচনা না করে অংশীদার হিসেবে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া গেলে হাইটেক পার্কগুলো দেশের প্রযুক্তি খাতে বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও উদ্ভাবনের কার্যকর কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।




















