নতুন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী বাড়াতে ভয়েস কলে ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে নিয়ে নাগরিক পরিসরে ইন্টারনেটের ব্যবহার ৪৫ থেকে ৭৫ শতাংশে যেতে পারে এবং ডিজিটাল খাতে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে বলে মনে করেন টেলিকম বিশেষজ্ঞ মাহতাব উদ্দিন আহমেদ। অবশ্য ইতিমধ্যে চারটি অপারেটরেই ভয়েস কল কমেছে জানিয়ে বিটিআরসির উপপরিচালক (সিস্টেমস অ্যান্ড সার্ভিস ডিভিশন) মোহাম্মদ ফারহান আলমও বলেছেন, ফ্লোর প্রাইস উঠিয়ে দিয়ে মনোপলি বা ওলিগোপলি (একচেটিয়া) হতে পারে।
তবে হঠাৎ করে ভয়েস ফ্লোর প্রাইস কমালে মোবাইল ইন্টারনেটের দাম ৫৯ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যেতে পারে বলে সেমিনারে মন্তব্য করেন রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম। তবে সাবেক এই অগ্রজ সহকর্মীর সঙ্গে দ্বিমত প্রকাশ করে তিনি বলেন, যে কোনো আলোচনার ক্ষেত্রেই আমাদের হলিস্টিক অ্যাপ্রোচ বেছে নিতে হবে। কেননা, বাংলাদেশে ভয়েস থেকে যে রাজস্ব আসে, সেটা দিয়ে ডেটার প্রচার–প্রসার করা হয়। এ কারণে আমাদের নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ১০০ ডিভাইসের মধ্যে ৭০ শতাংশের ওপরে চলে গেছে। তার মানে ডেটার ব্যবহার বাড়ছে।
তিনি আরও বলেন, গ্রহাক ও শিল্পের স্বার্থ রক্ষায় বিশ্বের ৪০টির মতো দেশে এখনও ফ্লোর প্রাইস রয়েছে। আর আমাদের দেশে এটি অনেকটাই অপ্রাসঙ্গিক। কেননা, আমরা কেউই ফ্লোরটা ফলো করি না। এর প্রাসঙ্গিতা অন্য জায়গায়। ফ্লোর তুলে দিলে এতোটাই মূল্যযুদ্ধ হবে তাতে ডেটার দাম ৫৯ শতাংশ বেড়ে যাবে। সরকার ৬ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে।
সাহেদ আলম বলেন, বাংলাদেশে ডাটা ব্যবহারের প্রসার বাড়াতে হলে ডাটার দাম কমানো জরুরি। এ ক্ষেত্রে নীতিনির্ধারকদের উচিত খরচ বাড়ায় এমন মধ্যবর্তী স্তরগুলো চিহ্নিত করে তা কমানো। ভয়েস কলের ফ্লোর প্রাইস নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে একটি পূর্ণাঙ্গ কস্ট স্টাডি করা প্রয়োজন। কেননা, সাধারণ দৃষ্টে কর ৫৪ শতাংশ দেখানো হলেও এখন তা ৫৬ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে। ফলে গ্রাহক এখন ১০০ টাকা রিচার্জ করলে তার ৫৬ টাকা সরকারের কাছে চলে যাচ্ছে। একইভাবে আমার মুনাফার ওপর করদায় পড়ছে ৭০ থেকে ৭২ শতাংশ। তাই গ্রাহক, অপারেটর এবং সরকারের রাজস্ব—সব দিক বিবেচনায় একটি ভারসাম্যপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হবে।
৫ এপ্রিল, রবিবার দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারের বিডিবিএল ভবনে ‘ভয়েস মূল্যসীমা প্রত্যাহার প্রস্তাব: মোবাইল সেবাকে জনবান্ধব করতে নতুন সরকারের করণীয়’ শীর্ষক সেমিনারে এমনটাই জানান তারা। সেমিনারের আয়োজক ভয়েস ফর রিফর্ম ও টেকনোলজি ইন্ডাস্ট্রি পলিসি অ্যাডভোকেসি প্ল্যাটফর্ম (টিআইপিএপি)।
পৃথিবীর কোনো দেশেই আমি ফ্লোর প্রাইস খুঁজে না পাওয়ার কথা জানিয়ে আলোচনায় অংশ নিয়ে বিটিআরসি’র উপপরিচালক মোহাম্মদ ফারহান আলম বলেন, কিছু কিছু দেশে প্রতিটি ট্যারিফ দেয়ার আগে রেগুলেটরের কাছ থেকে অনুমতি নেয়। কিছু দেশ পুরো বিষয়টি বাজারের ওপর ছেড়ে দিয়েছে। আমার মতে, ফ্লোর প্রাইস তুলে দিলে গ্রাহকের সুবিধা হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কেননা তখন সে বিভিন্ন ভাবে বান্ডেল অফার করতে পারবে। তবে এটাও সত্য ৩০ শতাংশ মানুষের হাতে স্মার্টফোন নেই। তাই তারা ভয়েস ও কল সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবেন। তাই যতদ্রুত সম্ভব কস্ট রিভিউ করা দরকার।
তিনি আরও বলেন, ভয়েস ফ্লোর সীমা ওঠিয়ে নেয়ার আগে আমার মনে পড়ছে, ২০০১ সালে ভয়েস মূল্য ১১ টাকা থাকলেও ২০১১ সালে তা নেমে ৮৩ পয়সায় হয়েছে। ২০১২ সালে মোবাইল গ্রাহক ছিল ৮ কোটি ৭ লাখ। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা বেড়ে ১০ কোটি ৭ লাখ হয়। কিন্তু ২০২৬ সালে হয়েছে ১০ কোটি ৮ লাখ। সাবসক্রাইবার অনুযায়ী তাদের মুনাফা হয়। গত এক বছরে চার অপারেটরেরই ভয়েস কলের গ্রোথ কমেছে। এসব বিষয় মাথায় না নিলে টেলিকম খাতে একেক বা দ্বৈত শক্তির দখলে চলে যেতে পারে।
ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড সেক্রেটারিজ অব বাংলাদেশের (আইসিএসবি) সভাপতি হোসন সাদাত বলেন, একমাত্র দেশ হিসেবে কেবল বাংলাদেশেই এখন ফ্লোর প্রাইস বিদ্যমান রয়েছে। দীর্ঘ দিন ধরেই এ বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। দাম কমালে আপাতদৃষ্টে অপারেটর এবং রেগুলেটর তাদের রাজস্ব আয় কমবে এবং গ্রাহক বাড়বে ও তারা উপকৃত হবে মনে করা হলেও দীর্ঘ মেয়াদে সবাই সুবিধা পাবে। ডিজিটাল বৈষম্যের সঙ্গে সামাজিক শুন্যতাকে আমলে নিতে হবে।
সেমিনার সঞ্চালনা করেন ভয়েস ফর রিফর্মের সহ–আহ্বায়ক ফাহিম মাশরুর। আলোচনায় অংশ নিয়ে বাংলালিংক এর একজন প্রতিনিধি বলেন, মূলত পুরো আলোচনাটাই অ্যাফোর্ডেবিলিটি নিয়ে হয়েছে। কিন্তু এট নির্ভর করে ইফিসেয়েন্সির ওপর। অথচ আমাদের দেশে এখনও অ্যাক্টিভ শেয়ার চালু হয়নি। রেভিনিউ না থাকলেও আইওটি সিমের ওপর ৩০০ টাকা ট্যাক্স দিতে হয়। বিভিন্ন চাপের আমাদের ৬৫ শতাংশ আরকু অবনমন করেছে। সর্বোপরি প্রতিযোগিতার পরিবেশ না থাকায়, বিশেষে করে মুনাফার ৯৫ শতাংশ এবং গ্রাহকের ৫০ শতাংশের বেশি যখন একটি কোম্পানির দখলে থাকে তখন আমাদের দক্ষতা উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করে।


















