দেশের সাড়ে ১৮ কোটি মোবাইল গ্রাহকের দীর্ঘদিনের অভিযোগ বাসাবাড়ি কিংবা অফিসের ভেতরে ঢুকলেই নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়ে পড়ে, দেখা দেয় কল ড্রপ আর ইন্টারনেটের ধীরগতি। গ্রাহকদের এই ভোগান্তি কমাতে এবং ইনডোর নেটওয়ার্ক কাভারেজ শক্তিশালী করতে এবার ‘ই-জিএসএম’ (Extended GSM) ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দের বড় উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশন (বিটিআরসি)। এই প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সম্প্রতি গ্রামীণফোনকে ৭০০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডে তরঙ্গ দেওয়ার পর এবার রবি আজিয়াটা এবং বাংলালিংককে পরীক্ষামূলকভাবে তরঙ্গ ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
বিটিআরসির সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোবাইল সংযোগ সংখ্যা প্রায় সাড়ে ১৮ কোটি। মোট গ্রাহকের ৪০ শতাংশ শহরাঞ্চলে থাকলেও সিংহভাগ অর্থাৎ ৬০ শতাংশই বাস করেন উপশহর ও প্রত্যন্ত গ্রাম এলাকায়। শহরে নেটওয়ার্কের মান তুলনামূলক গ্রহণযোগ্য হলেও ভবনের ভেতরে বা প্রান্তিক পর্যায়ে সংযোগ এখনো বেশ নড়বড়ে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহুতল ভবনের অভ্যন্তরে ডাটা স্পিড ও ভয়েস কলের মান নিয়ে গ্রাহক অসন্তোষ চরমে। এই সংকট নিরসনে নিম্ন ব্যান্ডের তরঙ্গ (Low Band Spectrum) অত্যন্ত কার্যকর, যা দেয়াল ভেদ করে ভেতরে পৌঁছাতে এবং দীর্ঘ দূরত্বে কাভারেজ দিতে সক্ষম।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিটিআরসির কাছে বর্তমানে ৮.৪ মেগাহার্টজ ‘ই-জিএসএম’ তরঙ্গ বরাদ্দযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্য থেকে রবি ও বাংলালিংক প্রত্যেকে ৩.৪ মেগাহার্টজ করে মোট ৬.৮ মেগাহার্টজ তরঙ্গ পাওয়ার জন্য আবেদন করেছে। তবে এই তরঙ্গ বরাদ্দের ক্ষেত্রে একটি কারিগরি চ্যালেঞ্জ রয়েছে। পার্শ্ববর্তী দেশে ব্যবহৃত ৮৫০ মেগাহার্টজ ব্যান্ডের তরঙ্গের সাথে বাংলাদেশের ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ডের কোনো ধরনের সংঘাত বা হস্তক্ষেপ (Interference) তৈরি হয় কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় এই সমস্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অপারেটররা। এই সম্ভাব্য কারিগরি জটিলতা যাচাই করতেই বিটিআরসি অপারেটর দুটিকে এক মাসের জন্য পুরো ৮.৪ মেগাহার্টজ তরঙ্গ পরীক্ষামূলক ব্যবহারের অনুমতি দিয়েছে।
রবি আজিয়াটার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তাদের গ্রাহকদের একটি বড় অংশ ইনডোর ডাটা সেবা নিয়ে সমস্যার কথা জানান। ‘ই-জিএসএম’ তরঙ্গ ব্যবহার শুরু হলে এই সমস্যার একটি টেকসই সমাধান মিলবে। এছাড়া এই প্রযুক্তি চালুর জন্য প্রয়োজনীয় কারিগরি সরঞ্জাম ও অবকাঠামো রবির আগে থেকেই প্রস্তুত রয়েছে, ফলে চূড়ান্ত বরাদ্দ পাওয়ামাত্রই গ্রাহকরা এর সুফল পেতে শুরু করবেন।
অন্যদিকে বাংলালিংক জানিয়েছে, এই এক মাসের পরীক্ষামূলক ব্যবহারের ফলাফল মূল্যায়ন করার পর তারা স্থায়ীভাবে তরঙ্গ কেনার বিষয়ে চূড়ান্ত ব্যবসায়িক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
টেলিকম বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের চারটি মোবাইল অপারেটর বর্তমানে সেবার মান বাড়াতে প্রতিযোগিতার মুখে রয়েছে। ‘ই-জিএসএম’ এবং ৭০০ মেগাহার্টজের মতো ব্যান্ডের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত হলে শুধু শহরের ভবনের ভেতরেই নয়, বরং দেশের প্রত্যন্ত ও সীমান্ত অঞ্চলেও নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক নিশ্চিত হবে। সীমান্ত এলাকায় দুই অপারেটরের জমা দেওয়া কার্যকারিতা প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে বিটিআরসি পরবর্তী সময়ে চূড়ান্ত তরঙ্গ বরাদ্দের মূল্য ও নীতিমালা নির্ধারণ করবে। এই উদ্যোগ সফল হলে দেশের ডিজিটাল অবকাঠামো আরও এক ধাপ এগিয়ে যাবে এবং গ্রাহকরা নির্বিঘ্নে উচ্চগতির ইন্টারনেট ও স্বচ্ছ ভয়েস কল উপভোগ করতে পারবেন।

















