মোবাইল ইন্টারনেটের ডেটা প্যাকের মেয়াদ নিয়ে গ্রাহকদের অসন্তোষ বিশ্বজুড়েই একটি আলোচিত বিষয়। আপনি টাকা দিয়ে কেনা ডেটা কেন নির্দিষ্ট সময় পর বাতিল হয়ে যাবে—এই প্রশ্নে অনেক দেশেই টেলিকম নীতিমালায় পরিবর্তন আনা হয়েছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ইন্টারনেট প্যাকের মেয়াদের ধরন বিশ্লেষণ করলে মূলত দুটি ভাগ দেখা যায়: একদল দেশ কড়াকড়িভাবে মেয়াদ (Validity) অনুসরণ করে, আর অন্য দল ‘ডেটা রোলওভার’ (Data Rollover) বা ‘মেয়াদহীন’ (No Validity) মডেলে চলে। নিচে এর একটি তুলনামূলক চিত্র তুলে ধরা হলো:
যেসব দেশে ইন্টারনেট প্যাকের নির্দিষ্ট মেয়াদ রয়েছে
সাধারণত দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোতে প্রি-পেইড মডেলে নির্দিষ্ট মেয়াদের (যেমন- ৩ দিন, ৭ দিন, ২৮ দিন, বা ৩০ দিন) ডেটা প্যাকের প্রচলন সবচেয়ে বেশি।
ভারত: বিশ্বের অন্যতম সস্তা ইন্টারনেটের দেশ হলেও ভারতে ডেটা প্যাকের নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে। সেখানে টেলিকম অপারেটররা (জিও, এয়ারটেল, ভি) ২৮, ৫৬ বা ৮৪ দিনের সাইকেলে ইন্টারনেট প্যাক বিক্রি করে।
পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কা: এই দেশগুলোতেও বাংলাদেশের মতোই দৈনিক, সাপ্তাহিক এবং মাসিক মেয়াদের ডেটা প্যাক প্রচলিত। মেয়াদ শেষে অব্যবহৃত ডেটা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায় (যদি একই প্যাক পুনরায় কেনা না হয়)।
সিঙ্গাপুর ও মালয়েশিয়া: এখানকার বেসিক প্রি-পেইড প্ল্যানগুলোতে সাধারণত ৩০ দিনের মেয়াদ থাকে। তবে কিছু নির্দিষ্ট প্ল্যানে অতিরিক্ত সুবিধা দেওয়া হয়।
যেসব দেশে মেয়াদের কড়াকড়ি নেই বা ‘মেয়াদহীন’ সুবিধা রয়েছে
উন্নত দেশগুলোতে সরাসরি “মেয়াদহীন” (Unlimited Validity) বলার চেয়ে ‘পে অ্যাজ ইউ গো’ (Pay As You Go) এবং ‘ডেটা রোলওভার’ (Data Rollover)—এই দুটি মডেলে গ্রাহকদের অব্যবহৃত ডেটা সুরক্ষার সুবিধা দেওয়া হয়। এসব দেশে সিম সচল থাকলে ডেটা বাতিল হয় না।
তাইওয়ান: টেলিকম সেবায় গ্রাহকবান্ধব নীতির জন্য তাইওয়ান সুপরিচিত। সেখানকার বেশ কয়েকটি অপারেটরের ‘ভলিউম-বেসড’ ডেটা প্যাক রয়েছে, যার কোনো নির্দিষ্ট মেয়াদ থাকে না। আপনি যতো জিবি (GB) কিনবেন, সিম সচল থাকা সাপেক্ষে তা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারবেন।
যুক্তরাজ্য (UK) ও যুক্তরাষ্ট্র (USA): এই দেশগুলোতে বেশিরভাগ ব্যবহারকারী মান্থলি সাবস্ক্রিপশন ব্যবহার করেন। তবে যারা ‘পে-অ্যাজ-ইউ-গো’ সিম ব্যবহার করেন, তাদের ডেটার কোনো মেয়াদ থাকে না। শর্ত থাকে শুধু নির্দিষ্ট সময় (যেমন- ৩ থেকে ৬ মাস) পরপর একটি কল বা এসএমএস করে সিমটি সচল রাখার।
অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড: এখানে ‘ডেটা রোলওভার’ বা ‘ডেটা ব্যাংক’ সুবিধা অত্যন্ত জনপ্রিয়। অর্থাৎ, আপনি এক মাসে কেনা ডেটা শেষ করতে না পারলে তা বাতিল হয় না, বরং তা জমা হয়ে পরবর্তী মাসের প্যাকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায়। অস্ট্রেলিয়ার টেলস্ট্রা (Telstra) বা নিউজিল্যান্ডের টু-ডিগ্রিজ (2degrees) এর মতো কোম্পানিগুলো বিশাল পরিমাণ অব্যবহৃত ডেটা জমানোর সুযোগ দেয়।
দক্ষিণ আফ্রিকা: দেশটির টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (ICASA) আইন করে অপারেটরদের বাধ্য করেছে যেন গ্রাহকের অব্যবহৃত ডেটা মেয়াদ শেষে বাতিল না হয়ে যায়। আইন অনুযায়ী, গ্রাহকরা তাদের বেঁচে যাওয়া ডেটা পরের মাসের জন্য রোলওভার করতে পারেন অথবা একই নেটওয়ার্কের অন্য ব্যবহারকারীকে ট্রান্সফার করে দিতে পারেন।
বাংলাদেশের বর্তমান চিত্র: ‘মেয়াদহীন’ প্যাকের বাস্তবতা
বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে ৩, ৭, ১৫ বা ৩০ দিনের মেয়াদের কড়াকড়ি ছিল। তবে গ্রাহকদের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) সম্প্রতি ‘মেয়াদহীন’ বা আনলিমিটেড মেয়াদের ডেটা প্যাক চালু করার নির্দেশ দেয়।
বাস্তবতা: প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতার কারণে অপারেটররা একেবারে ‘আজীবন’ মেয়াদের প্যাক দিতে পারে না। তাই বর্তমানে বাংলাদেশে ‘মেয়াদহীন’ প্যাক বলতে মূলত ১ বছর (৩৬৫ দিন) মেয়াদের ডেটা প্যাককে বোঝানো হয়।
ডেটা রোলওভার: বাংলাদেশেও এখন ডেটা রোলওভার সুবিধা রয়েছে। অর্থাৎ, মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই একই মেয়াদের (যেমন- ৩ দিনের প্যাক হলে আবার ৩ দিনের প্যাক) ডেটা কিনলে আগের অব্যবহৃত ডেটা নতুন ডেটার সাথে যোগ হয়ে যায়।
উন্নত দেশগুলোর মডেলে ডেটা কেনা হয় “পরিমাণ” (Volume) হিসেবে, আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ডেটা বিক্রি হয় “সময় ও পরিমাণের” (Time & Volume) শর্ত জুড়ে দিয়ে। তবে বিশ্বজুড়েই এখন গ্রাহক অধিকার রক্ষায় অব্যবহৃত ডেটা বাতিল না করে তা রোলওভার বা দীর্ঘমেয়াদে ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার প্রবণতা বাড়ছে।



















